কেন আমরা জন্মাই? আমাদের এই জীবনের অর্থ কি? উদ্দেশ্যই বা কি? কেন আমরা কর্মে আকৃষ্ট হই? কোন জ্ঞান বা কর্ম মানুষকে অমর করে?
মানুষের জীবনে এমন কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলি কোনো এক যুগের নয়—চিরন্তন।
যুগ বদলায়, সমাজ বদলায়, মানুষের জীবনযাত্রা বদলায়; কিন্তু মানুষের অন্তরের প্রশ্নগুলো একই রয়ে যায়। আমরা কেন জন্ম নিই? কেন আমরা কর্ম, সংগ্রাম, অর্জন ও সাফল্যের জন্য নিরন্তর ছুটে চলি? কেন কখনো আমাদের সব পরিশ্রম সফল হয়, আবার কখনো সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফল আমাদের হাতে আসে না?
আজকের পৃথিবীতে মানুষ অর্থ, প্রতিষ্ঠা, সম্মান ও সাফল্যের জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে। কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা, সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা—এই সবকিছুই মানুষের মনকে অবিরাম ব্যস্ত করে রাখে। আমরা ভাবি, আরও একটু অর্জন করতে পারলে হয়তো শান্তি আসবে।
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়— জীবনে সবকিছু আমাদের ইচ্ছামতো ঘটে না। কখনো আমরা দীর্ঘ পরিশ্রমের পরে সাফল্য লাভ করি, আবার কখনো সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। কখনো অপ্রত্যাশিত আনন্দ আসে, আবার কখনো হঠাৎ এমন কিছু ঘটে যা আমাদের সমস্ত পরিকল্পনাকে ভেঙে দেয়।
এই রহস্যময় জীবনের মাঝেই মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে—এই সমস্ত ঘটনার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কে?
বৈদিক দর্শন বলে—এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কার্যকলাপের অন্তরালে আছেন এক পরম নিয়ন্তা, ভগবান বিষ্ণু। জীবের জন্ম, কর্মের প্রবাহ, সাফল্য ও ব্যর্থতার ফল—সবই তাঁর মহাজাগতিক ব্যবস্থার অন্তর্গত। আমরা প্রত্যেকেই তাঁর মধ্যেই অবস্থান করি এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরই অধীন। এই উপলব্ধি মানুষকে এক গভীর মানসিক স্থিতি দেয়। তখন মানুষ শিখে যায়—সুখে যেন অহংকার না হয়, দুঃখে যেন হতাশা না আসে।
ভগবদ্গীতা-র ভাষায়, যে ব্যক্তি “সুখে অনুদ্বিগ্নমনাঃ, দুঃখে বিগতস্পৃহঃ”, সেই মানুষই প্রকৃত স্থিতপ্রজ্ঞ। সে জীবনের ওঠা-নামার মাঝেও নিজের অন্তরকে স্থির রাখতে পারে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল—এই গভীর প্রশ্নগুলো একসময় করেছিলেন এমন একজন, যাকে আমরা সাধারণত শত্রু হিসেবে জানি। তিনি হলেন বৃত্রাসুর।
বৃত্রাসুর কেবল শক্তিশালী অসুরই ছিলেন না; তিনি ছিলেন অসাধারণ তপস্যা ও কর্মশক্তির অধিকারী। নিজের তপস্যা ও পরাক্রমের দ্বারা তিনি একসময় দেবতাদের পরাজিত করে ইন্দ্রলোক পর্যন্ত জয় করেছিলেন। সেই দেবলোক, যা দেবতাদের সর্বোচ্চ অধিকারভূমি বলে বিবেচিত, তা একসময় তার শক্তির সামনে নত হয়েছিল। কিন্তু কালের নিয়ম চিরকাল একরকম থাকে না। দেবতাদের সঙ্গে পরবর্তী সংঘর্ষে সেই ইন্দ্রলোকই আবার তার হাত থেকে সরে যায়। অর্থাৎ যে সম্পদ একসময় তিনি কঠোর পরিশ্রম ও শক্তির দ্বারা অর্জন করেছিলেন, কিছুদিন পরে সেটিই তার হাতছাড়া হয়ে যায়।
মানুষের জীবনেও আমরা ঠিক এই দৃশ্যই দেখতে পাই। আমরা পরিশ্রম করি, সংগ্রাম করি, বহু কষ্ট সহ্য করে কোনো কিছু অর্জন করি—অর্থ, প্রতিষ্ঠা, সম্মান কিংবা জীবনের কাঙ্ক্ষিত কোনো সাফল্য। কিন্তু সময়ের প্রবাহে অনেক সময় সেই অর্জিত জিনিসই আবার আমাদের হাত থেকে চলে যায়। আবার অনেক কিছুই খুবই কাঙ্ক্ষিত থাকলেও আমাদের অধরাই রয়ে যায়।
এই অনিত্যতার নিয়ম থেকে কেউ মুক্ত নয়। কিন্তু এখানে বৃত্রাসুরের চরিত্রের এক আশ্চর্য দিক প্রকাশ পায়। ইন্দ্রলোকের মতো পরম সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার পরেও তিনি অস্থির হয়ে পড়েননি। তিনি হতাশ হননি, ক্রোধে বা বিষাদে ভেঙে পড়েননি; বরং তিনি স্থিরচিত্তে সেই ঘটনার কার্যক্রম বা তার ফলের দিকে না তাকিয়ে এগুলির বৃহৎ কারণের দিকে তাকিয়েছিলেন।
এই গভীর স্থিরতার মধ্যেই তার অন্তরে একের পর এক প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। জীবনের এই ওঠা–নামার প্রকৃত অর্থ কী? জন্ম, কর্ম, সাফল্য ও ব্যর্থতার অন্তরালে কী রহস্য লুকিয়ে আছে? এই ভাবনা থেকেই তার মনে জন্ম নেয় কিছু গভীর প্রশ্ন—যে প্রশ্নগুলি কেবল তার ব্যক্তিগত নয়; আজও মানুষের জীবনের সঙ্গে সমানভাবে সম্পর্কিত।
বৃত্রাসুর জানতে চেয়েছিলেন— কেন জীবের জন্ম হয়? কেন তারা বিভিন্ন কর্মে আকৃষ্ট হয়? কোন লক্ষ্য অর্জন করলে মানুষ অমর হতে পারে? এবং কোন কর্ম ও কোন জ্ঞান মানুষকে সেই অমরত্বের পথে নিয়ে যায়?
এই প্রশ্নগুলির মধ্যেই শুরু হয় এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান—মহাভারতের মধ্যেই এক সম্পূর্ণ অন্য গীতা, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে।
বৃত্রগীতা
“বৃত্রগীতা” নামটি উচ্চারণ করলেই আমাদের মনে বিস্ময় ও কৌতূহলের সঞ্চার হয়। ভারতীয় পাঠকদের কাছে বৃত্র পরিচিত এক মহাশক্তিধর অসুররূপে, যে দেব-শত্রুতার পরাকাষ্ঠা। সে-ই নদীগুলিকে গুহাগর্ভে আবদ্ধ করেছিল, সে-ই সমস্ত গাভীগুলিকে অজানা পর্বতগুহায় তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে রুদ্ধ করে রেখেছিল। স্বর্গের অধিপতি ইন্দ্রের জীবন-দগ্ধ করে তুলেছিল, সমগ্র জগৎকে করেছিল বিপর্যস্ত। তার দাপটের কথা স্বয়ং বেদেই বর্ণিত আছে। শেষ পর্যন্ত দেবরাজ ইন্দ্র—স্বর্গলোকের অধিপতি—তাঁকে পরাজিত করে বজ্রদারা বধ করেন। এই কাহিনি ভারতীয়দের কাছে বহুল পরিচিত। অনেক দিক থেকে এটি খ্রিষ্টীয় পুরাণে বর্ণিত সেই ঘটনাটির সঙ্গে তুলনীয়, যেখানে ঈশ্বরের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষের পরে শয়তান ও তার সহচরদের পতন ঘটে। শয়তান সেখানে ঘৃণার পাত্র; কিন্তু মহাভারত এই ভয় ও ঘৃণার পাত্র অসুরের মধ্যেও ভক্তির চেতনা প্রস্ফুটিত করে, জাগতিক মানুষের মধ্যে অনবরত চলতে থাকা জীবন সম্বন্ধীয় প্রশ্নগুলোকে এই ভয়াবহ অসুরের মুখনিঃসৃত করে এবং তার জ্ঞান প্রাপ্ত করার মাধ্যমে দর্শন শাস্ত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই যে সুপ্ত আসুরিক ভাব রয়েছে, যা স্বার্থ চরিতার্থ করতে বা স্বার্থে আঘাত লাগলে হঠাৎ সামনে এসে পড়ে, জীবন দর্শনের প্রশ্নে—ভগবত জ্ঞানের উত্তরে সেই আসুরিক প্রবৃত্তিকে দমন করে নিজের চেতনার উন্মেষ ঘটানোই এই বৃত্র গীতার উদ্দেশ্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, যারা এই পেজে নতুন তাদের জন্য, আমরা এর আগের পর্ব থেকে মহাভারতে শ্রীমৎ ভাগবত গীতা বাদেও আরো অন্যান্য যে ১৪ টি গীতা আছে তা নিয়ে আলোচনা করছি। শ্রীমৎ ভাগবত গীতার মতোই এই গীতা গুলিও মহাভারতের মধ্যে থেকেই শ্রীমৎ ভাগবত গীতার পাশাপাশি এই গীতা গুলিও আমাদের জীবনের নশ্বরতা সম্পর্কে সচেতন করে এবং শিক্ষা দেয় যে, পরমাত্মার সঙ্গে মিলনই হলো মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আমরা যদি মনে করি ধর্ম কেবল মন্দিরে বা হিমালয়ের গুহায় থাকে, তবে মহাভারতের এই স্বল্পালোচিত গীতাগুলো আমাদের সেই ধারণা বদলে দেবে। এখানে একজন গণিকা, একজন ব্যাধ, এমনকি একজন পরাজিত অসুররাজও হয়ে উঠেছেন পরম জ্ঞানের আধার। এখানে আমরা 'বৃত্র গীতা' নিয়ে আলোচনা করছি এবং এটি কয়েকটি অংশে হবে। অন্যান্য গীতা গুলি সম্পর্কে জানতে এবং মহাভারতের মধ্যে এই গীতা গুলির অবস্থান ও প্রয়োজন সম্পর্কিত তথ্য এবং আমাদের এই 'মহাভারতের গভীরে গীতার অন্বেষণ' সিরিজের সম্পর্কে জানতে এখানে দেওয়া লিংকে ক্লিক করে আগের পর্বটি করে পড়ে নিন।
এখন প্রশ্ন জাগে—কীভাবে সেই অসুররাজ বৃত্র নামের সঙ্গে “গীতা” শব্দটি যুক্ত হলো?
‘বৃত্র-গীতা’ নামটি কিন্তু এই রচনার ওপর আরোপিত কোনো আকস্মিক অভিধা নয়। কারণ গ্রন্থের মধ্যেই এর সূত্র বিদ্যমান। সেখানে বলা হয়েছে—
“অস্মিন্নর্থে পুরা গীতং শৃণুষ্বৈকমনা নৃপ।
যথা দৈত্যেন বৃত্রেণ ভ্রষ্টৈশ্বর্যেণ চেষ্টিতম্॥”
অর্থাৎ এই বিষয়েই একসময় এক গীতারূপ বাণী উচ্চারিত হয়েছিল—যা দৈত্যরাজ বৃত্র, রাজ্যচ্যুত অবস্থায়, প্রকাশ করেছিলেন। অর্থাৎ, এই আলোচ্য গ্রন্থের শিরোনামের সূত্রটি তার নিজের পাঠ্যবস্তুর মধ্যেই নিহিত।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে—একজন অসুরের নামের সঙ্গে ‘গীতা’ শব্দের সংযোগ এত আশ্চর্যের জন্ম দেয় কেন? এর উত্তর পেতে খুব বেশি দূর যেতে হয় না। আমাদের কাছে, ভারতীয়দের কাছে, ‘গীতা’ শব্দটি সর্বজনীনভাবে ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’-র সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে পরিচিত। এই ‘গীতা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘গান’ বা ‘সঙ্গীত’ হতে পারে। কিন্তু বড়ো ‘G’ যুক্ত ‘গীতা’ হলো কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণ-এর দিব্যবাণী। নশ্বর দেহে কৃষ্ণ স্বয়ং সর্বশক্তিমান।
অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্।
পরং ভাবমজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্।। ভ.গ. ৯.১১।।
অর্থঃ আমি যখন মনুষ্যরূপে অবতীর্ণ হই, তখন মুর্খেরা আমাকে অবজ্ঞা করে। তারা আমার পরম ভাব সম্বন্ধে অবগত হয় না এবং তারা আমাকে সর্বভূতের মহেশ্বর বলে জানে না।
তাঁর এই বাণীর শ্রোতা ছিলেন অর্জুন। এক বিশ্বযুদ্ধের ঘোর সংকটকালে কৃষ্ণ ও অর্জুনের কথোপকথন প্রসঙ্গে কৃষ্ণের এই ভাষণ স্বর্গ এবং তার বাইরেও ব্যাপ্ত, যা অস্তিত্বের সমস্ত জট খুলে দেয়। কার্লাইল তাঁর ‘হিরো অ্যাজ আ পোয়েট’-এ যেমন বলেছেন—সব মহৎ কবিতাই মূলগতভাবে একটি গান, তেমনই এই ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’ এক দিব্য সঙ্গীত। কিন্তু এক অসুর কি এমন কোনো মহৎ গান উচ্চারণ করতে পারে? এই প্রশ্নই আমাদের এই গ্রন্থটির গভীরে প্রবেশ করতে উৎসাহিত করে। আমরা জানতে চাই, বৃত্রর মতো মহাদানব, যে কিনা ভয় ও ঘৃণার পাত্র, তার মুখ থেকে কী ভাবে এমন উন্নত ভাবনার কথা নিঃসৃত হয়েছিল।
বৃত্রগীতার সূচনা হয় যুধিষ্ঠিরের বক্তব্য দিয়ে—
“ধন্যা ধন্যা ইতি জনাঃ সর্বেঽস্মান্প্রবদন্ত্যুত |
ন দুঃখিততরঃ কশ্চিৎপুমানস্মাভিরস্তি হ ||১||
লোকসম্ভাবিতৈর্দুঃখং যৎপ্রাপ্তং কুরুসত্তম |
প্রাপ্য জাতিং মনুষ্যেষু দেবৈরপি পিতামহ ||২||”
এই উক্তিটি তিনি সম্বোধন করেছিলেন ভীষ্মকে—কুরু ও পাণ্ডব উভয় বংশের মহাপিতামহকে। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে ভীষ্ম ছিলেন প্রধান যোদ্ধাদের অন্যতম। যুদ্ধের পর পাণ্ডবদের জ্যেষ্ঠ ভাই যুধিষ্ঠির তাঁর শর-শয্যার কাছে উপস্থিত হন। যুধিষ্ঠির নামের অর্থই হল—“যিনি যুদ্ধে স্থির”, অর্থাৎ যে ব্যক্তি বিপদের মধ্যেও ধৈর্য ও স্থিতি বজায় রাখে। কিন্তু মহাভারতের কাহিনিতে আমরা এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখি। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে পাণ্ডবরা শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ করলেও যুধিষ্ঠিরের মন স্থির থাকতে পারেনি। যুদ্ধের ভয়ংকর ধ্বংস, অসংখ্য আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যু এবং রাজ্য লাভের মূল্য তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তিনি বিজয়ের পরেও এক গভীর অস্থিরতার মধ্যে নিমজ্জিত হন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে মানুষেরা যদিও তাঁদের প্রশংসা করছে, তবু তিনি এবং তাঁর ভ্রাতারা এই বিজয়ে কোনো সুখ খুঁজে পাচ্ছেন না। সদ্য সমাপ্ত সেই ভয়াবহ যুদ্ধের পর তাঁদের মনে শান্তি নেই।
এই অবস্থাটি যুধিষ্ঠিরকে আরও বিচলিত করে, কারণ তিনি উপলব্ধি করেন যে তিনি ও তাঁর চার ভাই আসলে দেবাংশে জন্মগ্রহণ করেছেন—অর্থাৎ তাঁদের উৎস ঐশ্বরিক। অনেকটা গ্রিক পুরাণের বীরদের মতো—অ্যাকিলিস, পারসিয়াস, হারকিউলিস, থিসিয়াস প্রভৃতি। যাঁকে তিনি সম্বোধন করছেন, সেই ভীষ্মও দেবোৎপন্ন। তিনি রাজা শান্তনু ও গঙ্গা দেবীর পুত্র। গ্রিক পুরাণে যেমন অ্যাকিলিসের মাতাও এক নদীদেবী ছিলেন, তেমনি মহাভারতও দেবোৎপন্ন বীরদের কাহিনিতে পরিপূর্ণ। সেখানে নায়ক ও প্রতিনায়ক উভয়ই বহু ক্ষেত্রে দেবত্বের অংশধারী।
ফলস্বরূপ যুধিষ্ঠির জানতে চান, অলৌকিক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন সাধারণ মানুষের মতোই দুঃখ-কষ্ট তাঁদের গ্রাস করে? (আজকের যুগে এইভাবে দেখতে হবে যে প্রচুর ধন-সম্পত্তি ঐশ্বর্য সুখ বিলাস থাকা সত্ত্বেও কেন দুঃখকষ্ট বারবার আঘাত করে? কেন অর্থ সম্পদ দিয়েও সেইসব দুঃখ কষ্ট কে দূর করা যায় না?) তিনি এই রাজ্যপাট ত্যাগ করে সন্ন্যাসীর জীবন বেছে নিতে চান, যাতে আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রে তাঁকে আবদ্ধ হতে না হয়। এই বিষয়ে তিনি পিতামহের সম্মতিও প্রার্থনা করেন। মহাভারতের শান্তি পর্ব ও অনুশাসন পর্বে আমরা দেখি, ভীষ্ম শর-শয্যাগত অবস্থায় যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম, নীতিধর্ম ও জীবনের গভীর তত্ত্ব শিক্ষা দেন। সেই উপদেশের মাধ্যমেই যুধিষ্ঠির ধীরে ধীরে তার অন্তরের অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠেন।
এর পরবর্তী অংশে আমরা মহাভারতের শান্তি পর্বে ২৭০ নম্বর অধ্যায়ে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অবসানের পর যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে শর–শয্যায় শায়িত পিতামহ ভীষ্ম কে হস্তিনাপুরের নতুন রাজা সম্রাট যুধিষ্ঠির তার চিত্ত অস্থিরতা নিবারণের জন্য যে প্রশ্ন গুলি করেছিলেন এবং তার উত্তরে ভীষ্মদেব বৃত্র গীতা সম্পর্কিত যে জ্ঞান তাকে দিয়েছিলেন সেই সম্পর্কে আলোচনা করব এবং এই পর্বে উত্থিত প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা বৃত্র গীতার এবং সেই সম্পর্কিত অধ্যায়ের জ্ঞানালোকে খোঁজার চেষ্টা করব। বৃত্রাসুরের বিষ্ণুভক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে শ্রীমদ্ভাগবতমেও এর উল্লেখ বিশদভাবে পাওয়া যায় ষষ্ঠ স্কন্দে। আমরা আলোচনার সুবিধার্থে মহাভারত এবং শ্রীমদ্ভাগবতম এই দুইটি মহান শাস্ত্রের সাহায্যে আমাদের জ্ঞানান্বেষণ করব।