বৃত্র-গীতা, দ্বিতীয় অংশ: পরাজয়েও প্রশান্তি, বৃত্রা সুরের পূর্বজন্ম, চিত্রকেতুর শোক, মহর্ষি অঙ্গীরা ও নারদ মুনির কৃপা
এখানে ভীষ্ম হলেন কথক বা বর্ণনাকারী। কিন্তু বর্ণনা না করে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের মতো সরাসরি দৃশ্যটি আমাদের সামনে তুলে ধরেন। তাই আমরা দেখতে পাই ‘বৃত্র উবাচ’ এবং ‘উশনা উবাচ’ ইত্যাদি। প্রসঙ্গত, বৃত্রগীতা হলো মহাকাব্য মহাভারত-এরই একটি অংশ। মহাকাব্যের প্রথম কথক সৌতিও বর্ণনা না করে সরাসরি দৃশ্য দেখান। তাই সেখানে ‘ভীষ্ম উবাচ’ ও ‘যুধিষ্ঠির উবাচ’ দেখা যায়। ভীষ্মও একইভাবে বর্ণনা না করে কার্যটি প্রদর্শন করছেন। এই কৌশল মহাভারতের একটি বিশেষত্ব—যেখানে একটি গল্পের ভেতরে আরেকটি গল্প, একটি দরজায় ঢুকলে আরেকটি উঠোন এবং সেখানে আবার আরেকটি দরজা। স্বপ্নে স্বপ্ন দেখার মতো—পূর্বের স্বপ্নটি তবে বাস্তব ছিল, না হলে স্বপ্নের ভেতরে আবার স্বপ্ন আসে কী করে?
যারা এই পেজে নতুন তাদের জন্য, আমরা এর আগের পর্ব থেকে মহাভারতে শ্রীমৎ ভাগবত গীতা বাদেও আরো অন্যান্য যে ১৪ টি গীতা আছে তা নিয়ে আলোচনা করছি। শ্রীমৎ ভাগবত গীতার মতোই এই গীতা গুলিও মহাভারতের মধ্যে থেকেই শ্রীমৎ ভাগবত গীতার পাশাপাশি এই গীতা গুলিও আমাদের জীবনের নশ্বরতা সম্পর্কে সচেতন করে এবং শিক্ষা দেয় যে, পরমাত্মার সঙ্গে মিলনই হলো মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আমরা যদি মনে করি ধর্ম কেবল মন্দিরে বা হিমালয়ের গুহায় থাকে, তবে মহাভারতের এই স্বল্পালোচিত গীতাগুলো আমাদের সেই ধারণা বদলে দেবে। এখানে একজন গণিকা, একজন ব্যাধ, এমনকি একজন পরাজিত অসুররাজও হয়ে উঠেছেন পরম জ্ঞানের আধার। এখানে আমরা 'বৃত্র গীতা' নিয়ে আলোচনা করছি এবং এটি কয়েকটি অংশে হবে। এই পেজটি 'বৃত্র গীতা' সম্পর্কিত আলোচনার দ্বিতীয় অংশ। গত অংশে বৃত্র গীতার ভূমিকা এবং প্রত্যেক মানুষের জীবন সম্পর্কিত কয়েকটি চিরন্তন প্রশ্ন যার উত্তর শ্রীমদ্ভাগবত গীতা-র পাশাপাশি বৃত্র গীতাও আলোকপাত করেছে তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই অংশটি তে অগ্রসর হওয়ার আগে পূর্বের 'বৃত্রগীতা' সম্পর্কিত ভূমিকাটি পড়ে নিলে পাঠকদের পাঠ আস্বাদনের আনন্দ বৃদ্ধি হবে। মহাভারতের পাশাপাশি শ্রীমদ্ভাগবতম থেকেও আমরা এই পাঠের বিশেষ অংশের আস্বাদন করব কারণ যেখানে ভক্তির প্রশ্ন আসে সেখানে শ্রীমদ্ভাগবতমের সমান বা শ্রেষ্ঠ অন্য কিছুই নেই।
এছাড়াও মহাভারতের ভিতর অন্যান্য গীতা গুলি সম্পর্কে জানতে এবং এই গীতা গুলির প্রয়োজন সম্পর্কিত তথ্য এবং আমাদের এই 'মহাভারতের গভীরে গীতার অন্বেষণ' সিরিজের সম্পর্কে জানতে এখানে দেওয়া লিংকে ক্লিক করে আগের পর্বটি পড়ে নিন।
মূল শ্লোকের বঙ্গানুবাদ
মহাভারত, শান্তিপর্ব: অধ্যায় ২৭০
যুধিষ্ঠির বললেন—
"হে পিতামহ! সকল মানুষ আমাদের ধন্য ধন্য বলে প্রশংসা করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের চেয়ে দুঃখী মানুষ আর কেউ নেই (১)। হে কুরুশ্রেষ্ঠ! এই মনুষ্য জাতিতে জন্ম গ্রহণ করে দেবতারাও যা সহ্য করতে পারেন না, লোকসমাজে সম্মানিত হয়েও আমরা সেই দুঃখই প্রাপ্ত হয়েছি (২)। হে কুরুসত্তম! আমরা কবে এই দুঃখস্বরূপ সংসার ত্যাগ করে সংন্যাস গ্রহণ করব? এই শরীর ধারণ করাটাই এখন আমাদের কাছে দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে (৩)। হে প্রপিতামহ! সতেরোটি তত্ত্ব (পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চকর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চপ্রাণ, মন ও বুদ্ধি), পাঁচটি মহাভূত এবং আটটি গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে মুনিগণ আর জন্মগ্রহণ করেন না (৪)। হে পরন্তপ! কবে আমরা এই রাজ্য ত্যাগ করে সেই সংশিতব্রত মুনিদের মতো হতে পারব? (৫)"
ভীষ্মদেব বললেন—
"হে মহারাজ! এই জগতে কোনো কিছুই অনন্ত বা সীমাহীন নয়, সবকিছুই সংখ্যার অধীন। এমনকি পুনর্জন্মও নির্দিষ্ট সংখ্যার দ্বারা সীমাবদ্ধ। এখানে কিছুই চিরস্থায়ী বা অচল নয় (৬)। হে ধর্মজ্ঞ! কেবল শোক করে বা প্রসঙ্গে পড়ে সেই পরম গতি পাওয়া যায় না; সময়ের সাথে সাথে উদ্যোগ ও সাধনার দ্বারাই তোমরা সেই গতি লাভ করবে (৭)। হে নৃপতি! এই দেহধারী আত্মা পুণ্য ও পাপের কর্তা। নিজের কর্ম থেকেই উৎপন্ন অবিদ্যা বা তমোগুণের দ্বারা সে আচ্ছন্ন হয় (৮)। যেমন বায়ু যখন কাজল বা মনঃশিলার গুঁড়ো স্পর্শ করে, তখন সে সেই রঙেরই হয়ে যায় এবং চারদিক রঞ্জিত করে (৯), তেমনই এই জীবাত্মা কর্মফলের দ্বারা রঞ্জিত হয়ে এবং তমোগুণের দ্বারা আবৃত হয়ে বিভিন্ন বর্ণ (স্তর) ও যোনিতে বিচরণ করে (১০)। জীব যখন জ্ঞানের দ্বারা অজ্ঞানতা থেকে উৎপন্ন অন্ধকার বা মোহ দূর করতে পারে, তখনই সনাতন ব্রহ্ম প্রকাশিত হন (১১)। মুনিগণ বলেন যে, এই অবস্থা অত্যন্ত কঠিন সাধনার বিষয়; যারা মুক্ত হয়েছেন তাঁদের উপাসনা করা উচিত। তুমি এবং দেবতাসহ সকল লোক তাঁদের অনুসরণ করো, কারণ মহর্ষিরা কখনও নিষ্ক্রিয় হয়ে শান্ত হয়ে বসে থাকেন না (১২)।"
যুধিষ্ঠিরের এই বক্তব্যে দু'টি বিপরীত ভাবনা (প্যারাডক্স) প্রকট হয়ে ওঠে: প্রথমত, যুদ্ধে জয়লাভের মধ্যেও কোনো আনন্দ নেই; দ্বিতীয়ত, দেব-তুল্য মহাপুরুষদেরও সাধারণ মানুষের মতো দুঃখ সহ্য করতে হয়।
অপরদিকে বৃত্রাসুরের ক্ষেত্রে আমরা ঠিক বিপরীত এক চিত্র দেখি। বৃত্রাসুর ছিলেন অসুরকুলে জন্মগ্রহণকারী। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তিনি দেবতাদের শত্রু এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ইন্দ্রের বিরোধী। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল—যুদ্ধে পরাজয় এবং জীবনের চরম বিপর্যয়ের মাঝেও তিনি অন্তরে গভীরভাবে স্থির ছিলেন এবং ভগবানের স্মরণে অবিচল ছিলেন।
বৃত্রাসুরের পূর্বজীবন :
রাজা চিত্রকেতুর শোক, মহর্ষি অঙ্গীরা ও দেবর্ষি নারদের অহৈতুকি কৃপা
বৃত্রাসুরের এই বৈশিষ্ট্যের পেছনে ছিল তার পূর্বজন্মের আধ্যাত্মিক সাধনা। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃত্রাসুর পূর্বজন্মে ছিল রাজা চিত্রকেতু। এই কাহিনি প্রধানত পাওয়া যায় শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণের ষষ্ঠ স্কন্ধে। সেখানে বর্ণিত হয়েছে যে, চিত্রকেতু ছিলেন এক পরাক্রমশালী রাজা; কিন্তু পুত্রশোক ও সংসারের দুঃখ তাকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল। সেই সময় মহর্ষি নারদ ও অঙ্গিরা তাকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রদান করেন। তাদের উপদেশে চিত্রকেতু ভগবান নারায়ণের ভক্তিতে স্থিত হন এবং পরবর্তীকালে এক মহান যোগী-ভক্তে পরিণত হন। সেই সাধনার ফলে তিনি বিদ্যাধরদের অধিপতি হয়ে আকাশে বিচরণ করার ক্ষমতা লাভ করেন।
চিত্রকেতু থেকে বৃত্রাসুর — এক বিস্ময়কর সূচনা:
(শ্রীমদ্ভাগবতম—ষষ্ঠ স্কন্দ—চতুর্দশ অধ্যায়)
পরীক্ষিত মহারাজ প্রশ্ন করলেন—হে মহামুনিবর! এই জগতে অসংখ্য মুক্তপুরুষ, সিদ্ধপুরুষ বিচরণ করেন—তবুও তাদের মধ্যেও যিনি একান্তভাবে নারায়ণপরায়ণ, অন্তরে সম্পূর্ণ প্রশান্ত, এমন ভগবদ্ভক্ত সত্যিই অত্যন্ত দুর্লভ। ॥৫॥ এই কারণেই এক বিস্ময়কর প্রশ্ন উদিত হয়—যে বৃত্রাসুর ছিল সর্বলোকে ভয়ের কারণ, পাপাচারী ও দেবতাদের শত্রু—সে কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নিজের মনকে সম্পূর্ণরূপে শ্রীকৃষ্ণে নিবিষ্ট করতে পারল? ॥৬॥হে প্রভু! এই রহস্য আমার অন্তরকে আন্দোলিত করছে। আমি শুনতে চাই—কী সেই অতীত, কী সেই গূঢ় কারণ, যার ফলে এক অসুরও ভগবদ্ভক্তের শ্রেষ্ঠ আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে? ॥৭॥
শ্রীসূত বললেন—হে শৌনকাদি মুনিগণ! রাজর্ষি পরীক্ষিতের এই গভীর, হৃদয়স্পর্শী প্রশ্ন শুনে ভগবান শ্রীশুকদেব অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। ভক্তের হৃদয়ে যখন এমন জিজ্ঞাসা জাগে, তখনই শাস্ত্রের গুপ্ততত্ত্ব উন্মোচিত হয়। তাই তিনি সস্নেহে উত্তর দিতে শুরু করলেন। ॥৮॥
শ্রীশুকদেব বললেন—হে পরীক্ষিত! মন স্থির করে এই পবিত্র কাহিনী শোনো। এই ইতিহাস আমি আমার পিতা মহর্ষি ব্যাসদেব, দেবর্ষি নারদ ও মহর্ষি দেবল-এর কাছ থেকে শ্রবণ করেছি—এ এক অদ্ভুত লীলার কাহিনী, যেখানে দুঃখের অন্তরালে লুকিয়ে আছে ভগবানের অশেষ কৃপা। ॥৯॥
প্রাচীনকালে শূরসেন দেশে এক পরাক্রান্ত সম্রাট রাজত্ব করতেন—তাঁর নাম চিত্রকেতু। তাঁর শাসনে রাজ্য এমন সমৃদ্ধ ছিল যে, যেন স্বয়ং ভূমিদেবী প্রজাদের সকল কামনা পূরণ করতেন—অন্ন, ধন, ভোগ—কিছুরই অভাব ছিল না। ॥১০॥ রাজা চিত্রকেতুর ছিল অসংখ্য মহিষী—সংখ্যায় প্রায় এক কোটি! তিনি শক্তিমান, সক্ষম—তবুও বিধাতার লীলা দেখো—তাঁর কোনো পত্নীর গর্ভেই সন্তান জন্ম নিল না। ॥১১॥ সৌন্দর্য, বিদ্যা, কৌলীন্য, ঐশ্বর্য, ধন—সবই ছিল তাঁর অধীনে। কিন্তু একটি অভাব—একটি মাত্র অভাব—তাঁর সমস্ত জীবনকে শূন্য করে রেখেছিল—সন্তানহীনতা। ॥১২॥ যে সম্রাট সসাগরা পৃথিবীর অধিপতি, যার কাছে সব কিছু আছে—সেই তিনিই অন্তরে এক গভীর বিষাদের ভার বহন করতেন। কারণ সংসারের সুখ যতই হোক, সন্তানের অভাব সেই সুখকে ম্লান করে দেয়। ॥১৩॥
এই সময় একদিন, দয়াময় মহর্ষি অঙ্গিরা—যিনি বর ও অভিশাপ দানে সমর্থ—ভগবানেরই প্রেরণায় সেই রাজসভায় এসে উপস্থিত হলেন। ॥১৪॥ রাজা চিত্রকেতু তৎক্ষণাৎ উঠে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন। যথাযথ পাদ্য, অর্ঘ্য ও সম্মান দিয়ে পূজা করলেন। অতিথি-সেবা সম্পন্ন করে বিনয়ের সঙ্গে তাঁর সামনে বসে রইলেন। ॥১৫॥মহর্ষি অঙ্গিরা দেখলেন—এই মহাসম্রাট মাটিতে বসে আছেন, বিনয়ে অবনত। তাঁর অন্তরের দুঃখ তিনি অনুভব করলেন। স্নেহভরে তিনি প্রশ্ন করলেন— ॥১৬॥
“হে রাজন! তোমার রাজ্য, মন্ত্রী, ধন, সেনা—সব কি সুস্থ ও সুশৃঙ্খল আছে? যেমন জীব সাতটি আবরণে পরিবেষ্টিত, তেমনই রাজাও এই সাত উপাদানে পরিবেষ্টিত। এদের মঙ্গলেই তোমার মঙ্গল নিহিত।” ॥১৭॥ “তোমার প্রজা, ভৃত্য, মিত্র, পত্নী—সবাই কি তোমার বশে আছে?” ॥১৯॥ “কারণ যার মন নিজের বশে থাকে, সে-ই প্রকৃতপক্ষে সকলকে বশে রাখতে পারে।” ॥২০॥
এরপর তিনি গভীরভাবে রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন— “কিন্তু, হে রাজন… তোমার মুখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি, এক অপূর্ণতার ছাপ দেখছি। মনে হচ্ছে—তুমি অন্তরে সুখী নও। তোমার এই দুঃখের কারণ কী?” ॥২১॥ হে পরীক্ষিত! মহর্ষি অঙ্গিরা সর্বজ্ঞ ছিলেন—তিনি সবই জানতেন। তবুও ভক্তের হৃদয়ের কথা তাঁর মুখ থেকেই প্রকাশিত হোক—এই করুণাভাবেই তিনি প্রশ্ন করলেন। ॥২২॥
রাজা চিত্রকেতু বিনয়ের সঙ্গে বললেন— “হে প্রভু! যাঁদের তপস্যা ও জ্ঞান দ্বারা সমস্ত পাপ দগ্ধ হয়েছে, তাঁদের কাছে কিছুই অজানা নয়। তবুও আপনি জানতে চেয়েছেন, তাই আমি বলছি।” ॥২৩-২৪॥ “আমি এই পৃথিবীর সমস্ত ঐশ্বর্য পেয়েছি—যার জন্য দেবতারাও আকাঙ্ক্ষা করেন। কিন্তু পুত্র না থাকায় এই সব কিছুই আমার কাছে অর্থহীন—যেমন ক্ষুধার্তের কাছে অন্য সুখ অর্থহীন।” ॥২৫॥ “শুধু আমি নই—আমার পূর্বপুরুষেরাও পিণ্ডদানের অভাবে দুঃখ পাচ্ছেন। হে মহাত্মা! দয়া করে আমাকে এমন পুত্র দান করুন, যার দ্বারা আমরা সকলে মুক্তি লাভ করতে পারি।” ॥২৬॥
শ্রীশুকদেব বললেন—রাজার এই আর্ত প্রার্থনায় দয়াময় মহর্ষি অঙ্গিরা করুণাবশত ত্বষ্টাদেবতার উদ্দেশ্যে যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন এবং চরু আহুতি প্রদান করলেন। ॥২৭॥ চিত্রকেতুর মহিষীদের মধ্যে কৃতদ্যুতি ছিলেন জ্যেষ্ঠা ও শ্রেষ্ঠা। মহর্ষি সেই যজ্ঞাবশিষ্ট প্রসাদ তাঁকে প্রদান করলেন। ॥২৮॥
বিদায়ের সময় তিনি এক গভীর ভবিষ্যদ্বাণী করলেন—“হে রাজন! তোমার এক পুত্র জন্মাবে—সে তোমাকে হর্ষও দেবে, আবার শোকও দেবে।” ॥২৯॥
প্রসাদ গ্রহণের পর কৃতদ্যুতি গর্ভবতী হলেন। তাঁর গর্ভ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে লাগল—যেমন শুক্লপক্ষের চন্দ্র প্রতিদিন পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়। ॥৩০-৩১॥ অবশেষে শুভক্ষণে সেই পুত্র জন্মগ্রহণ করল। সমগ্র রাজ্য আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠল। ॥৩২॥ রাজা চিত্রকেতুর আনন্দের সীমা রইল না। তিনি ব্রাহ্মণদের দ্বারা সমস্ত সংস্কার সম্পন্ন করালেন এবং বিপুল দান করলেন—স্বর্ণ, গাভী, ভূমি, বস্ত্র, অলঙ্কার। ॥৩৩-৩৪॥ যেমন মেঘ সকল প্রাণীর জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করে, তেমনই তিনি প্রজাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করলেন। ॥৩৫॥ এই পুত্র ছিল তাঁর বহুদিনের আকাঙ্ক্ষার ফল—তাই তাঁর প্রতি স্নেহ দিন দিন গভীর হতে লাগল। ॥৩৬॥
মাতা কৃতদ্যুতির হৃদয়ও মাতৃস্নেহে ভরে উঠল। কিন্তু অন্য রাণীদের হৃদয়ে জ্বলে উঠল ঈর্ষার আগুন। ॥৩৭॥ রাজা ক্রমে কৃতদ্যুতির প্রতিই অধিক অনুরক্ত হয়ে উঠলেন—অন্যদের প্রতি তাঁর অনাদর স্পষ্ট হয়ে উঠল। ॥৩৮॥ এতে অন্য রাণীরা দুঃখে, অপমানে ও হিংসায় জ্বলতে লাগলেন। তাঁরা নিজেদের ভাগ্যকে ধিক্কার দিতে লাগলেন। ॥৩৯॥
তারা বলতে লাগল—“পুত্রহীনা স্ত্রী কত দুর্ভাগিনী! পুত্রবতী সপত্নী তাকে দাসীর মতো অপমান করে।” ॥৪০॥ “আমরা তো দাসীরও অধম!” ॥৪১॥ এইভাবে ঈর্ষা ক্রমে বিষে পরিণত হল। কৃতদ্যুতির প্রতি তাঁদের হৃদয়ে জন্ম নিল ভয়ংকর বিদ্বেষ। ॥৪২॥ অবশেষে সেই বিদ্বেষ এমনই ভয়ংকর রূপ নিল যে, তাঁরা নিষ্ঠুরচিত্ত হয়ে রাজপুত্রকে গোপনে বিষপ্রদান করল। ॥৪৩॥
কৃতদ্যুতি কিছুই জানতেন না। দূর থেকে দেখে ভাবলেন—শিশুটি ঘুমোচ্ছে। ॥৪৪॥ তিনি ধাত্রীকে বললেন—“ওকে নিয়ে এসো।” ॥৪৫॥ ধাত্রী গিয়ে দেখল—সব শেষ! শিশুটি নিথর পড়ে আছে—চোখ উল্টে গেছে, প্রাণ নেই। সে চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ॥৪৬॥ তার আর্তনাদ শুনে কৃতদ্যুতি ছুটে এলেন—আর এক মুহূর্তেই তাঁর জীবন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি শোকে মূর্ছিত হয়ে পড়লেন, কেশ এলোমেলো, বসন স্খলিত—সমস্ত অন্তঃপুর কাঁদতে লাগল। ॥৪৭-৪৮॥ রাজা চিত্রকেতুও এই সংবাদ শুনে ছুটে এলেন। পুত্রের মৃতদেহ দেখে তিনি ভেঙে পড়লেন—চোখ অশ্রুভারে আচ্ছন্ন, কণ্ঠ রুদ্ধ, প্রাণ যেন নিঃশেষ। ॥৫০-৫১॥
রানি কৃতদ্যুতি বিলাপ করতে লাগলেন— “হে বিধাতা! তুমি কি নির্মম? বৃদ্ধরা বেঁচে থাকে, আর শিশুরা মরে যায়—এ কেমন বিচার?” ॥৫৪॥ “বৎস! আমাকে ছেড়ে যেও না… তোমার পিতা শোকে কাতর… একবার চোখ খোলো…” ॥৫৬-৫৭॥ তাঁর আর্তনাদে সমগ্র রাজপ্রাসাদ শোকের সাগরে নিমজ্জিত হল। ॥৫৮-৬০॥ সমগ্র নগরী যখন শোকের সাগরে নিমজ্জিত, তখন মহর্ষি অঙ্গিরা ও দেবর্ষি নারদ সেখানে ছদ্মবেশে আবির্ভূত হলেন। ॥৫৯-৬১॥
মহর্ষি অঙ্গিরা ও দেবর্ষি নারদের উপদেশ
(শ্রীমদ্ভাগবতম—ষষ্ঠ স্কন্দ—পঞ্চদশ অধ্যায়)
তাঁরা মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকা রাজাকে বললেন— "রাজন, এই বালক এই জন্মে তোমার কে? আর তুমিই বা তার কে? ॥ ১-২ ॥ নদীর স্রোতে যেমন বালুকণা মিশে আবার আলাদা হয়ে যায়, সংসারও তেমন। জীব নিজের কর্মের ফলে একে অপরের সাথে মিলিত হয় আবার বিচ্ছিন্ন হয়।" ॥ ৩-৫ ॥ তাঁরা রাজাকে বোঝালেন যে, ঈশ্বরই সৃষ্টির কর্তা। তিনি বালকের মতো খেলাচ্ছলে সংসার গড়েন ও ভাঙেন। দেহ অনিত্য, কেবল আত্মাই সত্য। মাটির ঘটে যেমন ভেদ নেই, এই দেহের ভিন্নতায় আত্মার কোনো পরিবর্তন হয় না। ॥ ৬-৮ ॥
ঋষিদের কথায় রাজার মনে জ্ঞানের আলো জ্বলল। তিনি হাত দিয়ে চোখের জল মুছে জানতে চাইলেন— "প্রভু, আপনারা কারা? আপনারা নিশ্চয়ই কোনো পরমাত্মার দূত হয়ে আমাকে উদ্ধার করতে এসেছেন।" ॥ ৯-১৬ ॥
মহর্ষি অঙ্গিরা মৃদু হাস্যে বললেন—
“হে রাজন! তুমি যখন পুত্রের জন্য ব্যাকুল হয়েছিলে, তখন আমিই তোমাকে সেই পুত্র দিয়েছিলাম। আমি অঙ্গিরা, আর এ হলেন দেবর্ষি নারদ।” ॥১৭॥ “আজ তোমাকে এই শোকে নিমজ্জিত দেখে মনে হল—তুমি ভগবদ্ভক্ত, অথচ মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছো। তাই তোমাকে মুক্ত করার জন্যই আমরা এসেছি।” ॥১৮-১৯॥ “স্মরণ করো—আমি যখন প্রথম তোমার কাছে এসেছিলাম, তখনই তোমাকে জ্ঞান দিতে পারতাম। কিন্তু দেখলাম, তোমার চিত্ত পুত্রকামনায় আচ্ছন্ন। তাই তখন জ্ঞান না দিয়ে পুত্র দিয়েছিলাম।” ॥২০॥ “এখন নিজেই উপলব্ধি করো—পুত্র, স্ত্রী, ধন, রাজ্য—সবই দুঃখের কারণ। কারণ এগুলি অনিত্য, ক্ষণস্থায়ী।” ॥২১-২২॥ “এরা গন্ধর্বনগরের মতো—মনে হয় আছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নেই। স্বপ্নের মতো, ইন্দ্রজালের মতো—এক মুহূর্তে প্রকাশিত হয়, আবার লীন হয়ে যায়।” ॥২৩-২৪॥ “এই দেহ, ইন্দ্রিয়, মন—সবই দুঃখের কারণ। তাই মনকে সংযত করে আত্মতত্ত্বে স্থির হও, এবং পরম শান্তিতে প্রতিষ্ঠিত হও।” ॥২৫-২৬॥
এরপর দেবর্ষি নারদ করুণাভরা কণ্ঠে বললেন—
“হে রাজন! একাগ্রচিত্তে এই মন্ত্র গ্রহণ করবে। এই মন্ত্র জপ করলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তুমি শ্রীসংকর্ষণদেবের দর্শন লাভ করবে।” ॥২৭॥ “যার চরণে আশ্রয় নিয়ে দেবতাগণও সর্বোচ্চ সিদ্ধি লাভ করেছেন, সেই পরমপুরুষ শ্রীসংকর্ষণ—তাঁর কৃপায় তুমিও শীঘ্রই পরমপদ লাভ করবে।” ॥২৮॥
জীবাত্মার জাগরণ—মহাসত্যের প্রকাশ
(শ্রীমদ্ভাগবতম—ষষ্ঠ স্কন্দ—ষোড়শ অধ্যায়)
শ্রীশুকদেব বললেন—এরপর দেবর্ষি নারদ যোগবলে সেই মৃত বালকের জীবাত্মাকে আহ্বান করলেন। সকলের বিস্ময়ের মধ্যে তিনি বললেন— ॥১॥
“হে জীবাত্মা! তোমার মঙ্গল হোক। দেখো, তোমার পিতা-মাতা ও আত্মীয়রা তোমার জন্য শোকে কাতর। কিছুদিনের জন্য দেহে ফিরে এসে তাদের সান্ত্বনা দাও।” ॥২-৩॥
তখন সেই জীবাত্মা যেন চিরন্তন সত্যের কণ্ঠস্বর হয়ে উত্তর দিল—“হে দেবর্ষি! আমি আমার কর্মফলের বশে কত জন্মে ঘুরেছি—দেবতা, মানুষ, পশু—কোথায় যে কতবার জন্মেছি! এঁরা কোন জন্মের পিতা-মাতা?” ॥৪॥ “প্রত্যেক জন্মে সম্পর্ক বদলায়—কখনো বন্ধু, কখনো শত্রু, কখনো আত্মীয়।” ॥৫॥ “যেমন স্বর্ণ এক হাত থেকে অন্য হাতে যায়, তেমনই জীবও দেহান্তরে পরিভ্রমণ করে।” ॥৬॥ “সমস্ত সম্পর্কই সাময়িক—যতদিন থাকে, ততদিনই মমতা থাকে।” ॥৭॥ “আত্মা নিত্য, অবিনাশী, স্বয়ংপ্রকাশ। জন্ম-মৃত্যু তার নেই—সে কেবল সাক্ষী।” ॥৮-১০॥ “সে স্বাধীন, নির্লিপ্ত—কর্মফল তার উপর প্রভাব ফেলে না।” ॥১১॥
এই কথা শুনে আত্মীয়দের শোক ও মোহ কেটে গেল। তাঁরা শিশুর সৎকার করে সেই বন্ধন ছিন্ন করলেন। ॥১২-১৩॥ খুনি মহিষীরাও লজ্জিত হয়ে যমুনার তীরে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করলেন। ॥১৪॥
রাজা চিত্রকেতুও এক বিশাল গজরাজ যেমন কাদা থেকে নিজেকে মুক্ত করে, তেমনভাবে সংসার ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লেন। ॥১৫॥ তিনি যমুনার তীরে স্নান তর্পণ সেরে নারদ মুনির চরণে আশ্রয় নিলেন এবং মন্ত্র জপ করে ভগবানের দর্শন লাভের পথে অগ্রসর হলেন। ॥১৬-১৭॥
এর পরবর্তী অংশে আমরা দেবর্ষি নারদ কর্তৃক রাজা চিত্রকেতুকে সকল অবতারের অবতারী, সকল জগতের সৃষ্টির স্থিতি প্রলয়ের কারণ এবং কারক, সকল জীবের পরম আশ্রয় জগৎগুরু শ্রী সংকর্ষণ বলদেবের স্তব মন্ত্র প্রদান এবং রাজা চিত্রকেতু কিভাবে মাত্র সাত দিনের মধ্যে সেই স্তব জপ করে শ্রী সংকর্ষণ বলদেবের দর্শন পেলেন এবং তার অমৃত চরণকমলে শরণাগতী নিয়ে পরম বিষ্ণুভক্ত হলেন সেই সম্পর্কে আলোকপাত করবো।
শীঘ্রই প্রকাশিতব্য ▶