পরমানন্দ মাধবম Paramananda Madhabam
Paramananda Madhabam Banner

আপনি কি জানেন আজকে সারাবিশ্বে যে বিশাল নাম সংকীর্তন আন্দোলন চলেছে তার সূত্রপাত কোথায় হয়েছিল? জানেন কি নামহট্ট কে কোথায় প্রথম স্থাপন করেছিলেন? আর কেই বা এর প্রচার করেছিলেন?

শ্রী নিত্যানন্দ প্রভুর নামহট্টে শ্রীকৃষ্ণের অষ্টতর শতনাম, দ্বিজ হরিদাস ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব পরম্পরায় প্রবাহমান লোকসংস্কৃতি ◀ পূর্ববর্তী পেজ পরবর্তী পেজ ▶
শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম – শ্রীপাট খড়দহ
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভু কথিত, যে তিন জায়গায় তিনি সর্বদা নিত্য বিরাজ করবেন, তাদের মধ্যে একটি শ্রীপাট খড়দহ তে নিত্যানন্দ প্রভুর আঙিনায় — নিত্যানন্দ প্রভু প্রতিষ্ঠিত, নিত্যানন্দ প্রভুর শক্তি শ্রী জান্হবা মা ও নিত্যানন্দ প্রভুর পুত্র শ্রী বীরভদ্র গোস্বামী সেবিত, গত সাড়ে চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে নিত্য পুজিত ও সেবিত শ্রীশ্রী রাধা শ্যামসুন্দর জিউ।

শ্রীপাট খড়দহের পূণ্যভূমিতে শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু প্রতিষ্ঠিত
ও বীরভদ্র গোস্বামী কর্তৃক প্রচারিত ও প্রবাহিত নামহট্টের ইতিহাস

দ্বিজ হরিদাস কর্তৃক রচিত শ্রীকৃষ্ণের অষ্টতর শতনাম


গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধারায় নামসংকীর্তন কেবল একটি উপাসনাপদ্ধতি নয়—এটি সাধনা, দর্শন ও রসানুভূতির সমন্বিত জীবনচর্চা। ভক্তি আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র বঙ্গদেশ ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে নাম-সংকীর্তনের যে ধারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রবর্তন করেছিলেন, এই পদটি সেই ধারারই একটি শৈল্পিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিফলন। পদের শেষে “দ্বিজ হরিদাস কহে নাম-সংকীর্তন”—এই ভণিতা রচয়িতার পরিচয় নির্দেশ করে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব পদাবলী-তে 'হরিদাস' নামাঙ্কিত একাধিক কবি থাকলেও, এই পদের রচয়িতা হিসেবে 'দ্বিজ হরিদাস' বিশেষভাবে পরিচিত। মনে রাখা প্রয়োজন, ইনি মহাপ্রভুর পার্ষদ যবন হরিদাস ঠাকুর নন, বরং পরবর্তী সময়ের কোনো এক ভক্ত-কবি যিনি ব্রাহ্মণ কুলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন (তাই 'দ্বিজ' উপাধি)। গৌড়ীয় কীর্তন-পরম্পরা-য় এই রচনাটি 'শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম' বা 'কৃষ্ণের ১০৮টি নাম'-এর একটি সংকলন হলেও, এটি প্রচলিত সংস্কৃত শ্লোকের মতো নীরস নয়; এটি বাঙালির নিজস্ব 'পাঁচালি' বা 'কীর্তন' ঢঙে রচিত, প্রামাণ্য কীর্তন হিসাবে কালোত্তীর্ণ, সর্বজন স্বীকৃত ও সমাদৃত।

রচনাকাল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এটি জীবন্ত কীর্তন-সংস্কৃতির অংশ। গুরু-পরম্পরায় শেখানো ও গাওয়া হয়েছে—বিশেষত নামসংকীর্তনে। এই সংকীর্তনের সঠিক সময়কাল নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন হলেও, এর ভাষা ও ছন্দের গঠন বিশ্লেষণ করলে একে সপ্তদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের রচনা বলে অনুমান করা যায়। মহাপ্রভু-র পরবর্তী সময়ে বিশেষত নিত্যানন্দ প্রভু এবং তাঁর পুত্র বীরভদ্র গোস্বামী-র পৌরহিত্যে যখন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম ঘরে ঘরে বিস্তৃত হচ্ছিল, তখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ভজন ও নামকীর্তনের জন্য এই ধরণের সহজবোধ্য অথচ ভক্তিগীতিমূলক পদের উদ্ভব ঘটে। শ্রীচৈতন্য-এর প্রবর্তিত "হরে কৃষ্ণ" মহামন্ত্রের পাশাপাশি এই ধরণের বর্ণনামূলক শতনামসমূহ বাংলার লোকায়ত বৈষ্ণব সমাজ-এ এক বিশেষ স্থান করে নেয়।

যদিও পদটির রচয়িতা হিসেবে 'দ্বিজ হরিদাস'-এর নাম পাওয়া যায়, কিন্তু এই পদের জনপ্রিয়তা এবং এর প্রচারের মূলে রয়েছে খড়দহ-এর নিত্যানন্দ প্রভু-র পুত্র বীরভদ্র গোস্বামী-র পরিবার এবং নামহট্ট-এর সেই বিশাল ঐতিহ্য। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সন্ন্যাস গ্রহণ করে পুরীতে চলে গেলে, তিনি গৌড়দেশ (বাংলা)-এর গৃহস্থদের মধ্যে কৃষ্ণ নাম প্রচারের ভার অর্পণ করেছিলেন নিত্যানন্দ প্রভু-র ওপর। নিত্যানন্দ প্রভু জাত-পাত ও বাছবিচারহীন যে 'নামহট্ট' (নামের বাজার) তৈরি করেছিলেন, তার মূল কথা ছিল— "ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম"। নামহট্ট-এর উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মের মুখ্য উদ্দেশ্য কৃষ্ণ নাম পৌঁছে দেওয়া। সংস্কৃত শ্লোক সাধারণ মানুষ বুঝত না, তাই তাদের জন্য এই ধরণের বাংলা পয়ার ছন্দ-এ রচিত 'নাম-সংকীর্তন' বা 'শতনাম' তৈরি করা হয়েছিল। পদটিতে যে "বিফলে মনুষ্য-জন্ম যায় দিনে দিনে" বা "কৃষ্ণ ভজিবার তরে সংসারে আইনু" এই আক্ষেপগুলো পাওয়া যায়, এগুলো মূলত নিত্যানন্দ প্রভু-র প্রবর্তিত 'দৈন্য' ও 'শরণাগতি' ভাবের প্রতিফলন।

নিত্যানন্দ প্রভু প্রবর্তিত 'নামহট্ট' কোনো বিমূর্ত ধারণা ছিল না। ভক্তিবিনোদ ঠাকুর-এর 'নামহট্ট' বিষয়ক গ্রন্থসমূহ এবং খড়দহ-এর প্রাচীন পুঁথিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নামহট্ট-এর প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট কিছু পদ বা 'শতনাম' নির্ধারিত ছিল। দ্বিজ হরিদাস-এর এই পদটি সেই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। বৈষ্ণব গবেষক ডঃ বিমানবিহারী মজুমদার বা হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়-এর মতো পণ্ডিতরা যখন পদাবলী সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছেন, তখন তাঁরা এই ধরণের 'নাম-সংকীর্তন' বা 'পাঁচালি'-গুলোকে নিত্যানন্দ-শাখা-র লোকায়ত প্রচারের মাধ্যম হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন।

প্রখ্যাত বৈষ্ণব পণ্ডিত হরিদাস দাস সংকলিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধান (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) গৌড়ীয় বৈষ্ণব ইতিহাসের সবথেকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য হয়। এই অভিধানের 'কবি-পরিচয়' অংশে 'দ্বিজ হরিদাস' সম্পর্কে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। সেখানে তাঁকে খড়দহ-এর শ্রীশ্রী বীরভদ্র প্রভু-র শাখাভুক্ত কবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিখ্যাত গবেষক হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় তাঁর সম্পাদিত পদাবলী সাহিত্য-এ দ্বিজ হরিদাসের পদগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, পদকর্তা 'হরিদাস' নামধারী একাধিক ব্যক্তি থাকলেও 'দ্বিজ' (ব্রাহ্মণ) উপাধিধারী হরিদাস মূলত খড়দহ কেন্দ্রিক আন্দোলনের সমসাময়িক। এছাড়াও বীরভদ্র গোস্বামীর জীবনী এবং খড়দহ-এর ইতিহাস জানতে 'বীরভদ্র-বিলাস', 'নিত্যানন্দ বংশ-বিস্তার' ও 'নিত্যানন্দ শক্তি মা জাহ্নবা'; (নিত্যানন্দ-পত্নী জাহ্নবা মাতাবীরভদ্র প্রভু-র লীলা বিষয়ক গ্রন্থ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরণের শাখা-নির্ণয়কারী গ্রন্থগুলোতে বীরভদ্র প্রভু-র যে 'শিষ্য-শাখা' বা 'উপশাখা'-র তালিকা পাওয়া যায়, সেখানেই দ্বিজ হরিদাস-এর নাম অন্তর্ভুক্ত আছে। নরহরি চক্রবর্তী রচিত ভক্তি-রত্নাকর (অষ্টাদশ শতাব্দীর এই বিশাল গ্রন্থ) গ্রন্থে বৈষ্ণব আন্দোলনের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার বর্ণনা আছে। যদিও এখানে সরাসরি এই পদের প্রতিটি ছত্র নেই, কিন্তু খড়দহ-এর প্রচারক এবং পদকর্তাদের তালিকায় হরিদাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। 'শ্রীচৈতন্যচরিতের উপাদান' এবং 'পদাবলী সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থে ডঃ বিমানবিহারী মজুমদার দ্বিজ হরিদাসের এই অষ্টোত্তর শতনামটিকে একটি 'বিবর্তিত লোক-সংকীর্তন' হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর গবেষণায় খড়দহনামহট্ট-এর সাথে এই পদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। সুতরাং 'দ্বিজ হরিদাস' কোনো কাল্পনিক চরিত্র নন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধান এবং বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথির বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ছিলেন খড়দহ কেন্দ্রিক বীরভদ্র গোস্বামীর শিষ্য-পরম্পরার একজন কবি। খড়দহ-এর শ্রীশ্রী শ্যামসুন্দর মন্দির-এর সেবায়েত নিত্যানন্দ প্রভু এবং বীরভদ্র গোস্বামী-র পরিবারের সংরক্ষিত হস্তলিখিত পুঁথিতে এই শতনামটির প্রাচীনতম অনুলিপিগুলো পাওয়া যায়। খড়দহ-এর নাম-সংকীর্তনের যে নিজস্ব 'ঘরানা' আছে, তাতে এই পদটি কয়েকশো বছর ধরে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে আছে।

বৈষ্ণব সাহিত্যে 'ভণিতা' (পদের শেষে কবির নাম) একটি বড় প্রমাণ। এই পদে "দ্বিজ হরিদাস কহে নাম-সংকীর্তন" ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাঁকে অন্যান্য হরিদাস (যেমন যবন হরিদাস বা আদি হরিদাস) থেকে পৃথক করে এবং খড়দহ-এর ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব কবিদের ধারায় স্থাপন করে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন ভক্তিবিনোদ ঠাকুর 'নামহট্ট' পুনরুজ্জীবিত করেন, তখন তিনি প্রাচীন খড়দহশান্তিপুর-এর ধারার পুঁথিগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। সেই সময়কার মুদ্রিত 'নামহট্ট' বিষয়ক পুস্তিকাগুলোতে এই পদটিকে একটি প্রামাণ্য পাঠ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

নিত্যানন্দ প্রভু-র পুত্র বীরভদ্র গোস্বামী খড়দহকে কেন্দ্র করে যে বিশাল বৈষ্ণব সমাজ গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে এই সংকীর্তনটি একটি 'প্রাত্যহিক পাঠ' বা 'কীর্তন' হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। বীরভদ্র প্রভু ১২০০ 'নেড়া-নেড়ি' বা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। এই বিশাল জনসমষ্টির মুখে মুখে নাম প্রচারের জন্য দ্বিজ হরিদাস-এর এই পদটি ছিল এক পরম অস্ত্র। খড়দহ-এর নিত্যানন্দ প্রভু-র অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত নিত্যানন্দ শক্তি জান্হবা মাবীরভদ্র গোস্বামী সেবিত শ্রীশ্রী শ্যামসুন্দর জীউ-র মন্দিরে এবং বৈষ্ণব মহোৎসবগুলোতে এই পদটি গাওয়ার রীতি আজও প্রচলিত। বীরভদ্র গোস্বামী বিশ্বাস করতেন যে, কেবল পাণ্ডিত্য দিয়ে নয়, সহজ নামের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের পাষাণ হৃদয় গলানো সম্ভব। এই পদের "পাষাণ-উদ্ধার" বা "কাঙ্গালের ঠাকুর" শব্দবন্ধগুলো সেই দর্শনেরই প্রতিফলন।

"স্বরূপে সবার হয় গোলোকেতে স্থিতি।
বৈকুণ্ঠের বৈকুণ্ঠনাথ কমলার পতি ॥"
"বাসুদেব-প্রদ্যুম্নাদি-চতুর্ব্যূহ-সহ।
মহৈশ্বর্যপূর্ণ হ'য়ে বিহার করহ ॥"
এই যে 'চতুর্ব্যূহ' (বাসুদেব, সংকর্ষণ, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ) এবং 'ব্যূহ' তত্ত্বের উল্লেখ, এটি বীরভদ্র গোস্বামী-র প্রচারিত দার্শনিক তত্ত্বের সঙ্গে মিলে যায়।

"অনিরুদ্ধ সঙ্কর্ষণ নৃসিংহ বামন।
মৎস-কুর্ম-বরাহাদি অবতারগণ ॥"
সাধারণ 'অষ্টোত্তর শতনাম' সাধারণত কৃষ্ণের ১০৮টি বিশেষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এই পদে যেভাবে 'চতুর্ব্যূহ' (অনিরুদ্ধ-সঙ্কর্ষণ-বাসুদেব-প্রদ্যুম্ন) তত্ত্বকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্টত বীরভদ্র গোস্বামী-র প্রচারিত দর্শনের ইঙ্গিতবাহী। বীরভদ্র প্রভু 'অভেদানন্দ' বা অভেদ-তত্ত্ব প্রচারের সময় এই চতুর্ব্যূহ উপাসনা-র ওপর জোর দিতেন, যা এই পদে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি কৃষ্ণকে কেবল বৃন্দাবনের রাখাল হিসেবেই দেখেননি, বরং পরম তত্ত্ব হিসেবে প্রচার করেছিলেন যা এই পদের শেষের দিকে ফুটে উঠেছে।

চৈতন্যোত্তর ভক্তি-আন্দোলন-এর গণপ্রসার নিত্যানন্দবীরভদ্র-পরম্পরা-য় সুসংগঠিত হয়। এই সময়ে পয়ার-ভিত্তিক নামপাঁচালিআখ্যানমূলক কীর্তন-এর বিকাশ ঘটে।
“জয় জয় গোবিন্দ গোপাল…”
'শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম' কীর্তনটি ভাষা, ছন্দ ও ভাবধারায় সেই গণমুখী নিত্যানন্দ-শাখা-র সঙ্গে গভীর সামঞ্জস্য বহন করে। যদিও প্রত্যক্ষ দলিলভিত্তিক সংযোগ অনির্ধারিত, তবু সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এটিকে চৈতন্যোত্তর লোকায়ত নামআন্দোলন-এর পরিণত ফসল হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত।

ভাষার নান্দনিকতা ও কাব্যিক সুষমা
এই পদটি কেবল একটি ধর্মীয় পাঠ নয়, এটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এর ভাষার নান্দনিকতা কয়েকটি দিক থেকে বিচার্য। এটি সহজবোধ্য বাংলায় রচিত, যাতে তৎসম (সংস্কৃত) এবং তদ্ভব শব্দের এক চমৎকার মিশেল ঘটেছে।

ছন্দ ও যতি: পদটি মূলত পয়ার ছন্দ-এর আদলে রচিত। এর মধ্যে একটি সহজাত প্রবাহ বা 'মেলোডি' আছে যা তালি বা খোল-করতাল-এর সাথে সহজেই গাওয়া যায়। পয়ারধর্মী ছন্দে (প্রায় ১৪ মাত্রা-নির্ভর দ্বিপদী গঠন) রচিত। মধ্যযুগীয় বাংলা বৈষ্ণব পদাবলী-তে এই ধরণের সহজপাঠ্য, গীতিযোগ্য ছন্দ বহুল ব্যবহৃত। বৈশিষ্ট্যগুলি হলো— দ্বিপদী গঠন (প্রতি স্তবকে দুই পংক্তি), সুষম অন্ত্যমিল বা ধ্বনিগত সাদৃশ্য, উচ্চারণে স্বচ্ছন্দ ও কীর্তনোপযোগী তাল।

নাম-আবাহনধর্মী পুনরুক্তি: (“জয় জয়…”, “নাম রাখে…”, “রাখিল নাম…” ইত্যাদি)। এই পুনরুক্তি-রীতি কীর্তনের সমবেত গানে বিশেষ কার্যকর; গায়ক-দল ও জবাবি-দল (call-and-response) পদ্ধতিতে সহজে পরিবেশিত হয়।

শব্দালঙ্কার:
"গোবিন্দ গোপাল গদাধর"
"কৃষ্ণচন্দ্র করো কৃপা করুণা সাগর"
এখানে 'গ' এবং 'ক' বর্ণের অনুপ্রাস বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, যা শ্রুতিমধুরতা সৃষ্টি করে।

সহজ সরল বাংলা: সংস্কৃত শব্দের আধিক্য থাকলেও দ্বিজ হরিদাস এমনভাবে শব্দ নির্বাচন করেছেন যা গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের কাছেও সহজবোধ্য। লোকভাষার সহজতা ও কীর্তনোপযোগী সরলতায় এতে পাণ্ডিত্যের চেয়ে প্রাণের আবেগ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

ভাষা বিশ্লেষণে কয়েকটি লক্ষণ লক্ষণীয়—
“রাখিল”, “আইনু”, “হৈনু”, “কহে”—ইত্যাদি মধ্যযুগীয় বাংলার ক্রিয়ারূপ। এরমধ্যে সংস্কৃত-তৎসম শব্দের প্রাধান্য (বৈকুণ্ঠনাথ, চতুর্ভূজ, পরম ঈশ্বর, সৃষ্টি-স্থিতি) বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।

এই বৈশিষ্ট্যগুলো ইঙ্গিত করে যে রচনাটি মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব পদাবলী-র ধারা অনুসরণে রচিত। সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ণয় সম্ভব না হলেও ভাষার রীতি ১৬–১৮ শতকের গৌড়ীয় কীর্তন-পরিসর-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দার্শনিক ভাব ও ভক্তির নির্যাস
এই সংকীর্তনের মূল ভাব হলো 'শরণাগতি'।

নাম-মাহাত্ম্য: বৈষ্ণব দর্শনে নাম এবং নামী (ভগবান) অভিন্ন। এই পদে কৃষ্ণের বিভিন্ন লীলানির্ভর নাম (যথা: বকাসুর-নিধনকারী, কালীয়দমন, গিরিধারী) উচ্চারণের মাধ্যমে ভক্ত কৃষ্ণের সমগ্র লীলাটিকে মানসপটে অনুভব করার চেষ্টা করেন।

বন্দনা ও করুণার আর্তি:
"জয় জয় গোবিন্দ গোপাল গদাধর। কৃষ্ণচন্দ্র করো কৃপা করুণা সাগর ॥"
ব্যাখ্যা: পদকর্তা প্রথমেই 'জয়' ধ্বনির মাধ্যমে মঙ্গলাচরণ করেছেন। এখানে 'গদাধর' শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ; এটি বিষ্ণু-র রূপ স্মরণ করায়, আবার গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে গদাধর পণ্ডিত-এর (রাধারাণীর অবতার) প্রতিও ইঙ্গিত থাকতে পারে।

নান্দনিকতা: '' ও '' বর্ণের অনুপ্রাস এক অপূর্ব ধ্বনিমাধুর্য তৈরি করেছে। ভগবানকে এখানে 'করুণা সাগর' বলে সম্বোধন করা হয়েছে, যা ভক্তের পরম আশ্রয়ের জায়গা। —এই বাক্যটি ভক্তের দৈন্য ও ভগবানের কৃপার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা প্রকাশ করে। এটি গৌড়ীয় বৈষ্ণবীয় 'তৃণাদপি সুনীচেন' ভাবের প্রতিফলন।

লীলার বৈচিত্র্য: পদটিতে কৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলা, মথুরা লীলা এবং দ্বারকা লীলা-র সংক্ষিপ্ত উল্লেখ রয়েছে, যা পাঠ করলে ভক্তের চিত্তে 'অষ্টকালীয় লীলা'-র স্মৃতি জাগরিত হয়।

শ্রীকৃষ্ণের জন্ম থেকে লীলা-বিস্তার
এই সংকীর্তনটি একটি সুশৃঙ্খল জীবনীকাব্য-এর মতো অগ্রসর হয়েছে।

জন্ম ও শৈশব: দেবকী-র উদরে জন্ম থেকে শুরু করে যমুনা-র তীরে নন্দ-এর আলয়ে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ এখানে বর্ণিত।
"নন্দের আলয়ে কৃষ্ণ দিনে দিনে বাড়ে"
—এই একটি লাইনে ভক্তের হৃদয়ে বাৎসল্য রস-এর সঞ্চার হয়।

নামকরণের বৈচিত্র্য (পারিবারিক ও সখ্য ভাব): এই পদের সবথেকে সুন্দর অংশ হলো—কে কৃষ্ণকে কী নামে ডাকতেন। নন্দ-এর কাছে তিনি 'নন্দের নন্দন', যশোদা-র কাছে 'যাদু বাছাধন', আর সুবল-শ্রীদাম-এর কাছে তিনি 'ঠাকুর কানাই' বা 'রাখালরাজা'। এটি দেখায় যে ভগবান কতখানি 'আপন' হতে পারেন।

মায়াতীত রূপ: শ্রী রাধা-র কাছে তিনি 'কালোসোনা' আর কুজা-র কাছে 'পতিতপাবন'। অর্থাৎ, যার যেমন ভাব, কৃষ্ণের নামও তার কাছে তেমন।

জীবন-দর্শন ও বৈরাগ্য ভাব
সংকীর্তনের শুরুর দিকে কবি জাগতিক জীবনের অনিত্যতা নিয়ে এক অমোঘ সত্য তুলে ধরেছেন:
"দিন গেল মিছা কাজে রাত্রি গেল নিদ্রে। না ভজিনু রাধাকৃষ্ণ-চরণারবিন্দে ॥"
এখানে মানুষকে 'বৃক্ষ' এবং তার পুত্র-কন্যাকে 'ফল' ও সংসারকে 'পাখির বাসা'-র সাথে তুলনা করা হয়েছে। ডাল ভাঙলে যেমন ফল পড়ে যায়, তেমনি মৃত্যু অবধারিত। এই অংশটি ভক্তকে সংসার-মায়া-র ঊর্ধ্বে উঠে কৃষ্ণভজন-এ উদ্বুদ্ধ করে।

ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ব্যাপ্তি
এই পদে কৃষ্ণকে কেবল বৃন্দাবনের রাখাল হিসেবে রাখা হয়নি, বরং তাঁকে ত্রেতা যুগের রাম (লঙ্কায় রাবণ বধ), নৃসিংহ অবতার এবং বামন অবতার-এর সাথে একীভূত করা হয়েছে। অহল্যা উদ্ধার থেকে শুরু করে দ্রৌপদীর লজ্জা নিবারণ—প্রতিটি ঘটনার উল্লেখ কৃষ্ণের 'ভক্তবৎসল' রূপটিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
শ্রীপাট খড়দহ তে শ্রী নিত্যানন্দ প্রভুর অঙ্গনে শ্রী শ্রী রাধা শ্যামসুন্দর জীউ এর ভিতর স্বপার্ষদ শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভুর দিব্য দর্শন। মহাপ্রভুর প্রতিশ্রুতি তিনি নিত্যানন্দ প্রভুর এই অঙ্গনে নিত্য বিরাজ করবেন কলির শেষ অব্দি। নিত্যানন্দ প্রভু এই বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে এনার ভিতর স্বয়ং মহাপ্রভুকে দর্শন করতেন এবং নিত্যানন্দ প্রভুও স্বয়ং এই রাধা শ্যামসুন্দর জীউর শ্রী বিগ্রহের মধ্যে একটি অংশে অপ্রকট হয়েছিলেন। তাই এখানে একসাথে তিন ঠাকুরের দিব্য দর্শন এবং লীলা সান্নিধ্য লাভ হয়।

জয় নিতাই গৌড় রাধে শ্যাম হরে কৃষ্ণ হরে রাম।

এই আলোচনার পরবর্তী পেজ বা অংশে আমরা দ্বিজ হরিদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণের অষ্টতর শতনাম কীর্তনের মধ্যে মানব জন্মের সার্থকতা ও কৃষ্ণ ভক্তি ও শরণাগতির যে অমূল্য রত্ন মালা দেওয়া রয়েছে সেই সম্পর্কে আলোচনা করব।