শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম: মানবজন্মের সার্থকতা ও কৃষ্ণভক্তির দর্শন | part-3
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভু কথিত, যে তিন জায়গায় তিনি সর্বদা নিত্য বিরাজ করবেন,
তাদের মধ্যে একটি শ্রীপাট খড়দহ তে নিত্যানন্দ প্রভুর আঙিনায় —
নিত্যানন্দ প্রভু প্রতিষ্ঠিত, নিত্যানন্দ প্রভুর শক্তি শ্রী জান্হবা মা ও
নিত্যানন্দ প্রভুর পুত্র শ্রী বীরভদ্র গোস্বামী সেবিত,
গত সাড়ে চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে নিত্য পুজিত ও সেবিত
শ্রীশ্রী রাধা শ্যামসুন্দর জিউ।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন-এর প্রাণভোমরা হলো 'জীবের স্বরূপ হয় কৃষ্ণের নিত্যদাস'। দ্বিজ হরিদাস-এর রচিত এই অষ্টোত্তর শতনাম সংকীর্তনটি কেবল ভগবানের নামের সমষ্টি নয়, এটি মায়াবদ্ধ জীব-এর মুক্তির একটি দিকনির্দেশিকা। এই পদের প্রতিটি ছত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই নশ্বর পৃথিবীতে আমাদের আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো শ্রীকৃষ্ণভজন। যখন আমরা সেই উদ্দেশ্য ভুলে জাগতিক মোহে মত্ত হই, তখনই আমরা দুঃখের আবর্তে পতিত হই।
মায়ার স্বরূপ: কবি বলছেন, দিন যাচ্ছে মিছে কাজে আর রাত যাচ্ছে ঘুমে। আমরা যাকে 'উন্নতি' বা 'সাফল্য' ভাবছি, ভক্তিহীন অবস্থায় তা আসলে বিফল।
অনিত্যতার ছবি:
বাৎসল্য ও সখ্য ভাব: যশোদা-র কাছে তিনি 'যাদু বাছাধন', রাখাল বালকদের কাছে 'ঠাকুর কানাই'। এই নামগুলো আমাদের শেখায় যে, ভগবানকে ভয় নয়, বরং ভালোবাসার মাধ্যমে নিজের করে নিতে হয়।
আর্তের ত্রাণকর্তা: দ্রৌপদী-র 'দীনবন্ধু', গজ-এর 'মধুসূদন' বা অহল্যা-র 'পাষাণ-উদ্ধার'—এই নামগুলো প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে এই বিশ্বাস জাগায় যে, মানুষ যখন সবদিক থেকে অসহায় হয়, তখন শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র গতি।
শব্দ অলঙ্কার:
ছন্দবদ্ধ আত্মসমর্পণ: পয়ার-এর গতিতে যখন খোল ও করতাল সহযোগে শতনামের কীর্তন হয়, তখন একটি ধ্যানমগ্ন পরিবেশ তৈরি হয়।
উপসংহার:
দ্বিজ হরিদাস-এর এই অষ্টোত্তর শতনাম কেবল একটি সংগীত নয়, এটি একটি 'সাধ্য-সাধন' তত্ত্ব। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, নাম সংকীর্তনই হলো পরম ঔষধ যা আমাদের 'বৃক্ষসম' জড়তা থেকে মুক্তি দিয়ে ভগবানের নিত্যলীলা-র আস্বাদ দান করতে পারে। ভক্তের হৃদয়ে এই সংকীর্তন তাই কেবল সুর নয়, বরং কৃষ্ণের সাথে মিলনের এক আকুল প্রার্থনা।
মানবজন্মের উদ্দেশ্য ও সংসারের অসারতা
প্রবন্ধের এই অংশটি পদের সেই অমোঘ সত্যের ওপর ভিত্তি করে রচিত:
"কৃষ্ণ ভজিবার তরে সংসারে আইনু। মিছা-মায়ায় বদ্ধ হ'য়ে বৃক্ষসম হৈনু ॥"
বৈষ্ণব দর্শন অনুযায়ী, চুরাশি লক্ষ যোনি ভ্রমণ করে বহু ভাগ্যের ফলে এই 'দুর্লভ' মানবজন্ম লাভ হয়। এই জন্মের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে ভগবানের চরণে প্রত্যাবর্তন করা। কবি এখানে সংসারকে একটি 'বৃক্ষ' এবং জীবকে সেই বৃক্ষের সাথে তুলনা করেছেন। বৃক্ষ যেমন এক জায়গায় স্থাণু হয়ে থাকে, জীবও তেমনি মায়ার শিকড়ে আবদ্ধ হয়ে আধ্যাত্মিক গতি হারায়।
মায়ার স্বরূপ: কবি বলছেন, দিন যাচ্ছে মিছে কাজে আর রাত যাচ্ছে ঘুমে। আমরা যাকে 'উন্নতি' বা 'সাফল্য' ভাবছি, ভক্তিহীন অবস্থায় তা আসলে বিফল।
অনিত্যতার ছবি:
"ফলরূপে পুত্র-কন্যা ডাল ভাঙ্গি' পড়ে"
—এই ছত্রটি অত্যন্ত কঠোর কিন্তু বাস্তব। আমরা যাদের পরম আত্মীয় মনে করি, কালের নিয়মে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সংসার হলো সেই পাখির বাসা-র মতো, যেখানে কাল (মৃত্যু) রূপী পাখি যেকোনো সময় বাসা ভেঙে দিতে পারে। এই জাগতিক অসারতা অনুধাবন করাই হলো কৃষ্ণভজন-এর প্রথম ধাপ।
নামকীর্তন: কলি যুগের যুগ ধর্ম
গৌড়ীয় বৈষ্ণব পরম্পরা-য় বিশ্বাস করা হয় যে, কলিযুগ-এ কৃচ্ছ্রসাধন বা কঠিন যোগ সম্ভব নয়। তাই ভগবান নাম রূপেই অবতীর্ণ হন। দ্বিজ হরিদাস বলছেন:
"যেই নাম সেই কৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি। নামের সহিত আছেন আপনি শ্রীহরি ॥"
এই কীর্তনে কৃষ্ণের জন্মলীলা থেকে শুরু করে তাঁর অগণিত নামের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো—নাম জপ করতে করতে ভক্তের হৃদয়ে যেন সেই লীলাগুলো উদ্ভাসিত হয়। নামের মধ্য দিয়েই কৃষ্ণকে পাওয়া সম্ভব, কারণ নাম আর নামী (কৃষ্ণ) অভিন্ন।
লীলা ও নামকরণের বৈচিত্র্য: মাধুর্য ও ঐশ্বর্যের মিলন
এই সংকীর্তনের এক বিশেষ নান্দনিক দিক হলো কৃষ্ণের বিভিন্ন নাম, যা তাঁর জীবনের বিভিন্ন স্তরের ও সম্পর্কের পরিচায়ক। এটি প্রমাণ করে যে, কৃষ্ণভজন কোনো শুষ্ক সাধনা নয়, এটি এক পরম প্রেমময় সম্পর্ক।
বাৎসল্য ও সখ্য ভাব: যশোদা-র কাছে তিনি 'যাদু বাছাধন', রাখাল বালকদের কাছে 'ঠাকুর কানাই'। এই নামগুলো আমাদের শেখায় যে, ভগবানকে ভয় নয়, বরং ভালোবাসার মাধ্যমে নিজের করে নিতে হয়।
আর্তের ত্রাণকর্তা: দ্রৌপদী-র 'দীনবন্ধু', গজ-এর 'মধুসূদন' বা অহল্যা-র 'পাষাণ-উদ্ধার'—এই নামগুলো প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে এই বিশ্বাস জাগায় যে, মানুষ যখন সবদিক থেকে অসহায় হয়, তখন শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র গতি।
"কাঙ্গালের ঠাকুর"
বিদুর-এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে, ভক্তি থাকলে তিনি সামান্য খুদ খেয়েও তুষ্ট হন।
ভাষা শৈলী ও নান্দনিক ভাব
দ্বিজ হরিদাস-এর রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সরলতা ও আন্তরিকতা।
শব্দ অলঙ্কার:
"নবীন-নীরদ-কান্তি শিশুগোপবেশ"
"পীতাম্বর-বেণুধর"
এই শব্দগুলো এক অপূর্ব চিত্রকল্প তৈরি করে। 'নবীন-নীরদ' বা নতুন মেঘের মতো গায়ের রং, মাথায় ময়ূরের পালক—এই বর্ণনাগুলো ভক্তের হৃদয়ে এক ধরণের অলৌকিক প্রশান্তি (এস্থেটিক ডিলাইট) দান করে।
"পীতাম্বর-বেণুধর"
ছন্দবদ্ধ আত্মসমর্পণ: পয়ার-এর গতিতে যখন খোল ও করতাল সহযোগে শতনামের কীর্তন হয়, তখন একটি ধ্যানমগ্ন পরিবেশ তৈরি হয়।
"দ্বিজ হরিদাস কহে নাম-সংকীর্তন"
—বলে যখন কবি ইতি টানছেন, তখন তা আসলে সমস্ত পাণ্ডিত্য ত্যাগ করে শ্রীকৃষ্ণ-এর চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়ারই নামান্তর।
কৃষ্ণভজনই জীবনের শ্রেষ্ঠ পথ: উপসংহার
এই সংকীর্তনের মূল বার্তা হলো—সংসারে থেকেও অনাসক্ত হয়ে কৃষ্ণভজন করা। কবি সতর্ক করেছেন যে,
"পলাইতে পথ নাই যম আছে পিছে"
অর্থাৎ মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে, তাই বিলম্ব না করে এখনই কৃষ্ণনাম গ্রহণ করা উচিত।
"কৃষ্ণনাম হরিনাম বড়ই মধুর"
এই মাধুর্যই হলো বৈষ্ণব ধর্ম-এর নির্যাস। যে ব্যক্তি কৃষ্ণকে ভজে, কবি তাকেই 'চতুর' বা বুদ্ধিমান বলেছেন, কারণ সে এই অনিত্য সংসারের পরিবর্তে নিত্য পরমপদ লাভ করার চেষ্টা করছে।
উপসংহার:
দ্বিজ হরিদাস-এর এই অষ্টোত্তর শতনাম কেবল একটি সংগীত নয়, এটি একটি 'সাধ্য-সাধন' তত্ত্ব। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, নাম সংকীর্তনই হলো পরম ঔষধ যা আমাদের 'বৃক্ষসম' জড়তা থেকে মুক্তি দিয়ে ভগবানের নিত্যলীলা-র আস্বাদ দান করতে পারে। ভক্তের হৃদয়ে এই সংকীর্তন তাই কেবল সুর নয়, বরং কৃষ্ণের সাথে মিলনের এক আকুল প্রার্থনা।