শ্রীমদ্ভাগবতমে শ্রীকৃষ্ণের অঘাসুর বধ লীলা: ভক্তির নানাদিক ও ভগবানের করুণা এবং গৌড়ীয় আচার্যদের তাত্ত্বিক ভাষ্য
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই অঘাসুর বধ লীলায় পাপী জীবের মুক্তির মাধ্যমে কলিযুগের মানুষ হিসেবে আমরা কী শিক্ষা পাই—এই আলোচনার সেই উপসংহারে যাওয়ার আগে আসুন একবার দেখে নিই ভগবৎ ভক্ত বৈষ্ণব ভাষ্য ও টিকাকারগণ এই অঘাসুর বধ লীলা সম্পর্কে কী বলেছেন।
মৃত্যুর সময় ভগবানের সান্নিধ্য : শ্রীল জীব গোস্বামী পাদ
এই তত্ত্বটি গৌড়ীয় দর্শনে বিশেষভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। শ্রীল জীব গোস্বামী তাঁর কৃষ্ণ-সন্দর্ভ-এ স্পষ্ট করেন যে ভগবানের দেহ, নাম, গুণ, লীলা ও সান্নিধ্য—সবই চিন্ময় এবং স্বয়ং মুক্তিদায়ক। এমনকি যে জীব ভক্তিহীন, শত্রুভাবে বা অজ্ঞানতাবশত ভগবানের সংস্পর্শে আসে, সেও ধীরে ধীরে মুক্তির দিকে অগ্রসর হয়। অঘাসুর এই তত্ত্বের এক বাস্তব উদাহরণ।
শ্রীল জীব গোস্বামী—শ্রীকৃষ্ণ-সন্দর্ভে বলছেন যে পুতনা কেবলমাত্র স্তন্যপান করানোর মাধ্যমেই ভগবানের সান্নিধ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এই ভগবৎসান্নিধ্যের ফলেই সে সায়ুজ্যরূপ মুক্তি লাভ করেছিল। এই ক্ষেত্রে তার মধ্যে কোনো ভক্তিভাব ছিল না—বরং শত্রুতার মনোভাবই ছিল। তবুও ভগবানের চিন্ময় স্পর্শের ফলে তার সমস্ত বন্ধনের বিনাশ নিশ্চিতভাবে সংঘটিত হয়েছিল।
অঘাসুর ও বকাসুরের ক্ষেত্রেও এই একই নিয়ম প্রযোজ্য। শত্রুভাব নিয়েই তারা ভগবানের দেহের সংস্পর্শে এসেছিল, কিন্তু সেই সংস্পর্শের ফলেই তাদের জীবসত্তার সঙ্গে যুক্ত বন্ধন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অতএব স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এই যে—ভগবানের বিগ্রহের সঙ্গে সংযোগ নিজেই মুক্তির কারণ।
শ্রীল জীব গোস্বামী পাদ বলছেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অঘাসুরের দেহের ভেতরে যে পরিমাণ অগ্রসর হচ্ছিলেন, সেই অসুরের দেহটি ঠিক সেই পরিমাণেই পবিত্র হচ্ছিল। সূর্য উঠলে যেমন অন্ধকার দূর হয়, ভগবানের শ্রীবিগ্রহের স্পর্শে তেমনই অঘাসুরের পুঞ্জীভূত পাপরাশি দগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল।
“অতঃ প্রতিকূল-ভাবস্যাপি নিবৃত্তির্ভগবৎ-সন্নিধানেনৈব জাতা ।
যথা বহ্ণি-সংস্পর্শেন লৌহস্য মালিন্য-নিবৃত্তিস্তদ্বৎ ॥”
তাৎপর্য: তিনি এখানে অগ্নি ও লোহার উদাহরণ দিয়েছেন। লোহা কালো এবং শক্ত, কিন্তু আগুনের সংস্পর্শে এলে তা আগুনের মতো লাল ও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনই, অঘাসুর প্রতিকূল (শত্রু) ভাবে থাকলেও, স্বয়ং ভগবানের সান্নিধ্য লাভ করায় তার সেই প্রতিকূল ভাবটি পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং সে চিন্ময়তা লাভ করে। অর্থাৎ, ভগবানের সান্নিধ্য এতটাই শক্তিশালী যে তা আত্মার সমস্ত কালিমা মুছে দিয়ে তাকে স্বরূপ-স্থ করে।
জীব গোস্বামী বলছেন, শ্রীকৃষ্ণ অঘাসুরকে দয়া করার জন্যই সেখানে প্রবেশ করেছিলেন। যদিও অঘাসুর অনিষ্ট করার ইচ্ছা পোষণ করেছিল, কিন্তু ভগবান তার ভেতরে প্রবেশ করায় সেই অসুরের দেহ পবিত্র হয়ে যায় এবং সে সাযুজ্য মুক্তি (ভগবানের জ্যোতিতে লীন হওয়া) লাভ করে।
শ্রীল জীব গোস্বামী পাদ কয়েকটি বিষয় এখানে প্রমাণিত করেছেন যে—
স্পর্শ-তত্ত্ব: ভগবানের পাদপদ্ম বা শ্রীবিগ্রহের স্পর্শ মানেই জড় জগতের কলুষতা থেকে মুক্তি।
প্রতিকূলতা বিনাশ: শ্রীল জীব গোস্বামী জোর দিয়েছেন যে, কৃষ্ণকে কেউ শত্রুভাবে ভজনা করলেও (কামাত্ দ্বেষাৎ ভয়াৎ স্নেহাৎ), সান্নিধ্যের প্রভাবে সেই শত্রুতা দূর হয়ে শুদ্ধিকরণ ঘটে।
মাধুর্য-লোভ: মুক্তির চেয়েও ভগবানের রূপ দর্শন বড়—এটাই অঘাসুরের জ্যোতির অপেক্ষা করার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
অঘাসুর এতদিন কেবল নিজের কামনা পূর্তির জন্য কৃষ্ণ চিন্তা করে এসেছে, সে কখনোই ভগবত স্বরূপ বা শ্রীকৃষ্ণের মাধুর্য রূপের চিন্তা—দূরে থাক, কল্পনাও করেনি। মৃত্যুর পর তার জ্যোতির্ময় শুদ্ধ আত্মা কলেবর মুক্ত হতেই সে মোহন বংশীধারী মধুসূদনের বৃন্দাবনে তাঁর প্রিয় সখা আর বৎসদের সঙ্গে এই মাধুর্য লীলা দর্শন করে এতটাই মোহিত হয়ে গেল যে নিজের সাযুজ্য মুক্তির ক্ষণও বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চিন্ময় ধাম বৃন্দাবন ও শ্যামসুন্দর-এর রূপ-মাধুরী ও লীলা ঐশ্বর্য দর্শন করে অবশেষে সে ভগবৎ চরণে লীন হয়ে গেল।
শ্রী বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর তাঁর ‘সারার্থ-দর্শিনী’ (শ্রীমদ্ভাগবতম্ ১০.১২ অধ্যায়) টীকায় অঘাসুরের মুক্তি অত্যন্ত চমৎকার এবং কাব্যিক রসতত্ত্বে বিশ্লেষণ করেছেন। শ্রীল জীব গোস্বামী যেখানে তত্ত্ব ও ঐশ্বর্যের ওপর জোর দিয়েছেন, বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর সেখানে ভগবানের মাধুর্য, কৃপা এবং ভক্তবাৎসল্যকে প্রধান্য দিয়েছেন।
নিচে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী বিশদ আলোচনা করা হলো:
অঘাসুরের মুক্তি: কৃপা না কি দণ্ড?
শ্রী বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর প্রশ্ন তুলেছেন—অঘাসুর তো কৃষ্ণকে মারতে চেয়েছিল, তবে সে মুক্তি পেল কেন? তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, অঘাসুর যখন মুখ ব্যাদান করে ছিল, তখন তার সেই বিশাল গুহার মতো মুখের ভেতর শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সখাদের নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। এই প্রবেশের ফলে শ্রীকৃষ্ণের শ্রীবিগ্রহের সুগন্ধ এবং তাঁর চরণস্পর্শে অঘাসুরের দেহ ও অন্তঃকরণ মুহূর্তের মধ্যে পবিত্র হয়ে যায়। শ্রী বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর বলেন, “অঘাসুর কৃষ্ণকে ভক্ষণ করতে চেয়েছিল, আর কৃষ্ণ তাকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করে নিলেন।”
সাযুজ্য মুক্তির নিগূঢ় কারণ
অঘাসুর যে ‘সাযুজ্য মুক্তি’ (কৃষ্ণের জ্যোতিতে লীন হওয়া) লাভ করল, তার পেছনে ঠাকুর একটি বিশেষ যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেন, অঘাসুর যখন মুখ হাঁ করে ছিল, তখন ভগবান তার দেহের ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন। মাতা যশোদাকে শিশু কৃষ্ণ তাঁর মুখের মধ্যেই যে সমগ্র চরাচর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অবস্থান করে তা লীলার ছলে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
অঘাসুর যেহেতু ক্ষণকালের জন্য হলেও ভগবানকে নিজের উদরে ধারণ করার (ভক্ষণ করার ছলে) চেষ্টা করেছিল, তাই তাকে ‘মাতৃবৎ’ বা এক ধরণের অদ্ভুত সেবার ফল প্রদান করা হয়েছে—ঠিক যেমন পুতনাকে প্রদান করা হয়েছিল। বকাসুরের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটেছিল। বকাসুরও শ্রীকৃষ্ণকে গলাধঃকরণ করে অনেকক্ষণ তার গলার মধ্যে রেখে দিয়েছিল এবং মুক্তির পরে সেও শ্রীকৃষ্ণের অনন্ত জ্যোতিতে লীন হয়ে গিয়েছিল।
ব্রহ্মার বিস্ময়
অঘাসুরের জ্যোতি যখন আকাশে অপেক্ষা করে অবশেষে কৃষ্ণের চরণে লীন হলো, তখন দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন। বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর এখানে উল্লেখ করেছেন যে, এই মুক্তি দেখে ব্রহ্মা অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন—পাপিষ্ঠ অঘাসুর কোনো সাধনা ছাড়াই যে গতি পেল, তা যোগীরা হাজার বছর তপস্যা করেও পায় না।
এর কারণ হলো ‘ভক্তি-যোগের আভাস’। অঘাসুর যেহেতু কৃষ্ণের সখাদের এবং কৃষ্ণকে নিজের দেহের সংস্পর্শে এনেছিল, তাই সেই দিব্য স্পর্শই তার মুক্তির কারণ।
সখাদের প্রতি কৃষ্ণের বাৎসল্য
বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর এই লীলায় কৃষ্ণের ‘আকুলতা’ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যখন কৃষ্ণ দেখলেন তাঁর প্রিয় সখারা অসুরের পেটে চলে গেছে, তখন তিনি সাধারণ মানুষের মতো কিছুটা শোকাতুর ও বিচলিত হওয়ার ভান করেছিলেন (লীলা-মানুষ)। তিনি দ্রুত অঘাসুরকে বধ করেন যাতে সখাদের কোনো ক্ষতি না হয়। ঠাকুরের মতে, এটি কৃষ্ণের ভক্ত-পরবশতা বা ভক্তের প্রতি তাঁর অধীনতার চরম নিদর্শন।
সংক্ষেপে
বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুরের মতে, অঘাসুরের মুক্তি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি হলো ভগবানের অকারণ করুণা। তিনি অঘাসুরকে শত্রু হিসেবে দেখেননি, বরং সে তাঁর ভক্তদের (সখা গোপালকদের) নিজের আশ্রয়ে (মুখে) নিয়েছিল বলে কৃষ্ণ তাকে নিজের দিব্য জ্যোতিতে আশ্রয় দিয়ে ধন্য করেছেন। ঠাকুর এই মুক্তিকে ‘অঘ-মোক্ষণ’ বা পাপের চিরতরে মুক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এখানে বলদেব বিদ্যাভূষণ–এর ব্যাখ্যাও স্মরণীয়। তিনি বলেন—ভগবান-যুক্ত মৃত্যু নিজেই অপবর্গের হেতু। অর্থাৎ মৃত্যুর সময় চিত্ত যদি ভগবানে যুক্ত থাকে, তবে সেই মৃত্যুই বন্ধননাশক হয়ে ওঠে। অঘাসুরের মৃত্যু ছিল এমনই এক ভগবান-যুক্ত মৃত্যু।
অন্তকালে চ মামেব স্মরন্
মুক্ত্বা কলে বরম্ ।
যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং
যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ ॥
ভগবদ্গীতা ৮.৫–৮.৬
অর্থ (সংক্ষেপ):
যে ব্যক্তি মৃত্যুকালে আমাকে স্মরণ করে দেহ ত্যাগ করে,
সে আমার ভাবই প্রাপ্ত হয়—এতে কোনো সংশয় নেই।
বলদেব বিদ্যাভূষণ তাঁর ভগবদ্গীতা ভাষ্যে একটি স্পষ্ট তত্ত্ব দেন—মৃত্যুর সময় চিত্ত যদি ভগবানে যুক্ত থাকে, তবে সেই মৃত্যুই অপবর্গ (মুক্তি)-এর হেতু।
শ্রীল বলদেব বিদ্যাভূষণ পাদ তাঁর ‘সারার্থ-বর্ষিণী’ (শ্রীমদ্ভাগবতম্ টীকা) এবং তাঁর অন্যান্য তাত্ত্বিক গ্রন্থে অঘাসুর বধ লীলাকে ভগবানের অচিন্ত্য-শক্তি এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করুণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। শ্রীজীব গোস্বামী বা বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর-এর তুলনায় তাঁর ব্যাখ্যায় যুক্তি এবং ন্যায়-শাস্ত্রের একটি বিশেষ প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।
নিচে শ্রীল বলদেব বিদ্যাভূষণের ভাষ্য অনুযায়ী অঘাসুর মুক্তির মূল দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
‘সাযুজ্য’ মুক্তির বিশেষ বিচার
বলদেব বিদ্যাভূষণ প্রশ্ন তুলেছেন যে, ভক্তরা যেখানে সাযুজ্য মুক্তি (ভগবানের জ্যোতিতে লীন হওয়া) চান না, সেখানে অঘাসুরকে কেন এই গতি দেওয়া হলো?
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, অঘাসুর যেহেতু অত্যন্ত ঘোর অপরাধী ছিল, তাই তাকে সরাসরি প্রেমা-ভক্তি দেওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু যেহেতু সে ভগবানের শরীরের স্পর্শ পেয়েছে, তাই তার নরকবাস রদ হয়ে সে ব্রহ্মজ্যোতিতে লীন হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। একে তিনি ‘দণ্ডজ-কৃপা’ (শাস্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত কৃপা) হিসেবে দেখেছেন।
অঘাসুরের দেহের ‘পবিত্রতা’ ও ‘শুদ্ধি’
বলদেব বিদ্যাভূষণ তাঁর টীকায় উল্লেখ করেছেন যে, অঘাসুর যখন মুখ হাঁ করেছিল, তখন তার পেটের ভেতর শ্রীকৃষ্ণের চরণস্পর্শ ঘটেছিল।
তাঁর মতে, ভগবানের পাদপদ্ম হলো পরম তীর্থ। সেই পাদপদ্ম অঘাসুরের শরীরের ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই তার সমস্ত স্থূল ও সূক্ষ্ম শরীর (পাপের সংস্কার) দগ্ধ হয়ে যায়। তিনি একে ‘স্পর্শমণি’-র সাথে তুলনা করেছেন—স্পর্শমণি যেমন লোহাকে সোনা করে, কৃষ্ণের স্পর্শও অঘাসুরকে চিন্ময় করে তুলেছিল।
ব্রহ্মার মোহের কারণ (যুক্তি নির্ভর ব্যাখ্যা)
এই লীলার পর ব্রহ্মা কেন মোহিত হয়েছিলেন, তার একটি দার্শনিক কারণ বলদেব বিদ্যাভূষণ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ব্রহ্মা দেখলেন যে কৃষ্ণ একজন ছোট বালকের মতো অঘাসুরের পেটে ঢুকে পড়লেন (যেন তিনি ভয় পেয়েছেন বা বুঝতে পারেননি)। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলেন কৃষ্ণ তাকে মুক্তি দিলেন।
বলদেব বিদ্যাভূষণের মতে, ভগবানের নর-লীলা (মানুষের মতো আচরণ) এবং ঈশ্বরত্ব (অলৌকিক ক্ষমতা) যখন একসাথে প্রকট হয়, তখন স্বয়ং ব্রহ্মার মতো দেবতারাও বিভ্রান্ত হন। এটি কৃষ্ণের শক্তির এক অপূর্ব মাহাত্ম্য।
অঘাসুর ও পুতনার তুলনা
বলদেব বিদ্যাভূষণ অঘাসুরকে পুতনার চেয়েও বড় অপরাধী হিসেবে দেখিয়েছেন, কারণ অঘাসুর কৃষ্ণের সখাদেরও কষ্ট দিতে চেয়েছিল।
তবুও অঘাসুর যে গতি পেল, তার পেছনে বলদেব বিদ্যাভূষণ কৃষ্ণের ‘মাধুর্য-শক্তি’কে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, কৃষ্ণের সান্নিধ্য এতটাই মাধুর্যময় যে তা সকল প্রকার তিক্ততা বা শত্রুতাকে গ্রাস করে নেয়।
শ্রীপাদ বলদেব বিদ্যাভূষণ মূলত দেখাতে চেয়েছেন যে ভগবানের সান্নিধ্যই সকল মঙ্গলের মূল। অঘাসুর কোনো ভক্তি করেনি, কিন্তু বিদ্বেষবশত হলেও ভগবানের শরীরের সংস্পর্শে আসার ফলে সে পরম গতি লাভ করেছে।
তিনি তাঁর ‘গোবিন্দ ভাষ্য’ বা ‘প্রমেয় রত্নাবলী’-তে এই ধরণের অসুরদের মুক্তিকে ভগবানের স্বতন্ত্র ইচ্ছা এবং অসীম দয়া-র এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
উপসংহার
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ—তিনি লীলা পুরুষোত্তম। তাঁর কাছে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ—কিছুই অজানা নয়। কোন দিন কোথায় কি ঘটবে, কার জীবনে কোন মুহূর্তে কোন লীলা প্রস্ফুটিত হবে—সবই তাঁর অন্তরে পূর্ব থেকেই সুস্পষ্ট। তবু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি কখনো সেই সর্বজ্ঞতার অহংকার প্রকাশ করেন না। বরং সাধারণ মানুষের মতোই আচরণ করে সকলকে তাঁর লীলার অমৃত স্বাদ আস্বাদন করান।
সেই দিনটিও তেমনই এক দিন। দিনের শুরু থেকেই যেন তিনি জানতেন—আজ বৃন্দাবনের বুকে এক বিরল ঘটনা ঘটতে চলেছে। অঘাসুরের মুক্তি সেই ঘটনারই একটি অধ্যায়। তবু ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে তিনি যেন একেবারে স্বাভাবিক এক রাখাল বালকের মতো শিঙা বাজিয়ে সকল সখাকে ডাকলেন। গোবৎসদের সঙ্গে বনভোজনের পরিকল্পনা হল, আর সবাই আনন্দে উল্লসিত হয়ে বেরিয়ে পড়ল বৃন্দাবনের সেই মনোরম প্রান্তরে—গোবর্ধনের পাদদেশে, যেখানে ফুল, ফল, লতা ও বৃক্ষের অপরূপ সমারোহে প্রকৃতিই যেন কৃষ্ণের লীলার জন্য সাজিয়ে রেখেছে এক স্বর্গীয় মঞ্চ।
কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ জানতেন—আজ তাঁর একটি বিশেষ কর্তব্য রয়েছে। তাঁর ভক্ত অষ্টবক্র মুনি একদিন অঘাসুরকে বর দিয়েছিলেন—যেদিন শ্রীকৃষ্ণ স্বইচ্ছায় তার উদরে প্রবেশ করবেন, সেদিনই তার সর্পরূপ থেকে মুক্তি ঘটবে। ভক্তের সেই কথার মান রক্ষা করতেই যেন ভগবান নিজেই এই লীলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে শুধু একটি অভিশাপের অবসান ঘটানোই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। এই ঘটনার মধ্যে তিনি আরও গভীর তত্ত্ব জুড়ে দিলেন—যাতে তাঁর ভক্তরা ভক্তিরসের এক অপূর্ব আস্বাদন করতে পারে।
সখাদের এই লীলার মধ্যে প্রবেশ করিয়ে তিনি যেন দুই ধরনের সাধনার এক বিস্ময়কর তুলনা তুলে ধরলেন—একদিকে শুদ্ধ প্রেমিক ভক্ত, আর অন্যদিকে জাগতিক কামনা-বাসনায় আবদ্ধ জীব।
অঘাসুরের পরিবারও আশ্চর্য ভাগ্যবান। ভাই বকাসুর, বোন পুতনা—এরা যেন পূর্বজন্ম থেকেই শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের এক অদ্ভুত নিয়তি নিয়ে জন্মেছিল। যদিও এই জন্মে তারা সেই স্মৃতি বিস্মৃত ছিল। কিন্তু অঘাসুরের ভাগ্য আরও বিস্ময়কর। সে কেবল কৃষ্ণের দর্শনই পেল না—অষ্টবক্র মুনির অভিশাপ ও আশীর্বাদের মধ্য দিয়ে ভগবানের শ্রীচরণকমল-এর স্পর্শও লাভ করল।
যে চরণকমলের স্পর্শ তো দূরের কথা—কেবল তার দর্শন লাভ করাও বহু যোগী ও দেবতার পক্ষে দুর্লভ। অথচ ভক্তের কথার মান রাখতে ভগবান সেই অমূল্য কৃপাও অনায়াসে অঘাসুরের মতো পাপীকেও দান করলেন।
অঘাসুরের মনেও কিন্তু কৃষ্ণের চিন্তা নিরন্তর চলছিল। যদিও তা ছিল স্বার্থের জন্য। সে ভাবছিল—কে এই কৃষ্ণ? কোথায় তাকে পাওয়া যাবে? কবে সে আমার সামনে আসবে? কিভাবে সে মুখে প্রবেশ করবে আর কেনই বা করবে?
এই একাগ্র চিন্তাই অঘাসুরের কৃষ্ণপ্রাপ্তির পথ খুলে দিল—যা অষ্টবক্র মুনির অভিশাপ ও আশীর্বাদেরই এক অপূর্ব পরিণতি।
তবে এখানে একটি গভীর সত্যও প্রকাশ পায়। যারা ভগবানকে কেবল স্বার্থসিদ্ধির জন্য চায়, যারা তাঁর প্রতি প্রেম নিবেদন করে না—তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলেই তারা ভগবানকেই শত্রু বলে মনে করে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ পরম কৃপাময়। কেউ যদি শত্রুভাবেও তাঁকে নিরন্তর চিন্তা করে, তবুও তিনি তাকে পরিত্যাগ করেন না—বরং সেই চিন্তার মধ্য দিয়েই তাকে নিজের কৃপায় টেনে নেন।
অন্যদিকে শুদ্ধ প্রেমিক ভক্তেরা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা তাদের সমস্ত ভার ভগবানের উপর অর্পণ করে নিশ্চিন্তে তাঁর লীলার মধ্যে নিজেদের সমর্পণ করে দেয়। তাদের মনে কোন ভয় থাকে না, কোন সংশয় থাকে না। কারণ তাদের বিশ্বাস একটাই—
“অবশ্যই রক্ষীবে কৃষ্ণ।”
যে পরিস্থিতিই আসুক না কেন, তারা জানে—কৃষ্ণই তাদের রক্ষা করবেন। শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্যে থেকে তাকে লীলা আনন্দ প্রদান করা, তাকে নানাভাবে সেবা করাই তাদের লক্ষ্য। মুক্তির ইচ্ছা তাদের কাছে নিছক স্বার্থপরতা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। শ্রীমদ্ভাগবতমে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলার মধ্য দিয়ে শ্রী শুকদেব গোস্বামী বারবার ভগবান ও তার প্রেমিক ভক্তের সেই শুদ্ধ ভক্তি রসকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এই বিশ্বাসেই সেদিন কৃষ্ণের সখারা সমস্ত আশঙ্কা দূরে সরিয়ে আনন্দের সঙ্গে গোবৎসসহ অঘাসুরের গুহার মতো মুখের ভিতর প্রবেশ করেছিল। আর অঘাসুর তখন নিজের মনে হিসাব করছিল—কিভাবে এমনভাবে কৃষ্ণকে বধ করা যায় যাতে তার দুই উদ্দেশ্যই পূর্ণ হয়—একদিকে কৃষ্ণ ও তাঁর সখাদের মৃত্যু, আর অন্যদিকে তার নিজের অভিশাপ থেকে মুক্তি।
অঘাসুরের মুখের সামনে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণ যেন এই দুই ভজনপথের পার্থক্যকেই প্রকাশ করলেন।
এই লীলা দেখে স্বয়ং ব্রহ্মাও বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি ভাবতেই পারলেন না—একজন সাধারণ রাখাল বালক কিভাবে এমন মহাশক্তিশালী অসুরকে পরাভূত করতে পারে! সেই বিস্ময়ই পরে ব্রহ্মার মনে সন্দেহের সঞ্চার করল—এই বালক কি সত্যিই ভগবান?
এই সন্দেহ থেকেই তিনি শ্রীকৃষ্ণকে পরীক্ষা করতে এলেন। কিন্তু সেই পরীক্ষার মধ্য দিয়েই তাঁর মোহভঙ্গ ঘটল—এখানে আবার তিনি দেখালেন শুদ্ধ ভক্তির সাথে রজগুণী ভক্তির তুলনা। শুদ্ধ ভক্ত কখনো কৃষ্ণের কোন কার্যেই সন্দেহ করে না, আশঙ্কাও করে না। সেই আশ্চর্য লীলার কথাই আমরা পরবর্তী ব্লগে আরও বিশদে জানতে পারব।
সবশেষে স্মরণ করতে হয় শ্রীধাম বৃন্দাবনের কথা। কারণ এই ভূমি সাধারণ কোন স্থান নয়। এখানে তখন স্বয়ং বৃন্দাবনেশ্বরী বিরাজমান। তার কৃপা বিনা বৃন্দাবনের পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ ঘটে এমন সাধ্য কার। আর এই পবিত্র ভূমিতে ভগবানের স্পর্শ যার ভাগ্যে জোটে, তার মুক্তি যে সর্বোচ্চ হবে—এ নিয়ে আর কোন সন্দেহ থাকে না। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের মাধুর্য ঐশ্বর্য এতই মধুর ও মনোগ্রাহী যে অঘাসুর পার্থিব শরীর ত্যাগ করে ভগবানের মাধুর্য ঐশ্বর্য দর্শন করে তার মুক্তির ইচ্ছেটাই যেন ভুলে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ চিদ্ধাম বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণের অদ্ভুত মাধুর্য ঐশ্বর্য দর্শন করে তারপর তার শ্রী চরণের ব্রহ্ম জ্যোতিতে বিলীন হয়ে গেলেন।
📚 প্রাসঙ্গিক বই ও ভিডিও
Little Krishna Adventures Books for Kids
“Little Krishna Adventures: Krishna and Aghasura the Giant Serpent: An Illustrated Hindu Mythology Story for Kids
by Chayan Chatterjee”
📕 Paperback Edition
📙 Hardcover Edition
🎥 অঘাসুর লীলা (ভিডিও)
অঘাসুর উদ্ধার লীলা এই ব্লগের ভিডিও ভার্সন — [পরবর্তীতে লিংক যুক্ত হবে]— পরমানন্দ মাধবম —