Thursday, January 29, 2026

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অঘাসুর উদ্ধার লীলা : ভক্তির আলোকে দু’টি দিক

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অঘাসুর উদ্ধার লীলা : ভক্তির আলোকে দু’টি দিক

— শ্রীকৃষ্ণের লীলায় ছদ্মবেশী বিপদ ও পাপী জীবের মুক্তি —


ব্রজলীলার অঘাসুর পর্বকে সাধারণভাবে একটি অসুরবধের কাহিনি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের দৃষ্টিতে এই লীলা কেবল বধের গল্প নয়— এটি এক গভীর ভক্তিতাত্ত্বিক উপাখ্যান, যেখানে একসঙ্গে প্রকাশ পায় জীবনের বাস্তবতা এবং ভগবানের অহৈতুকী কৃপা।

অঘাসুরের সারুপ্য মুক্তি: পাপী জীবের উপরও শ্রীকৃষ্ণর কৃপা

অঘাসুর এখানে হঠাৎ আক্রমণকারী কোনো অসুর নয়। সে আসে গুহার রূপ ধরে—আনন্দ ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। এই ছদ্মবেশী রূপই লীলাটিকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে দেয়।

একই সঙ্গে আমরা দেখি—এই অঘাসুরই শেষ পর্যন্ত লাভ করে অতি দুর্লভ মুক্তি, যে মুক্তির জন্য যুগ যুগ ধরে যোগী ও ভক্তেরা সাধনা করে। এই দ্বৈত বাস্তবতা—ভয়ংকর বিপদ ও পরম কৃপা— এই লীলাকে অনন্য করে তোলে।

এই ব্লগে অঘাসুর লীলাকে আমরা ভক্তির আলোকে দু'টি পৃথক কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত দিক থেকে দেখব—

✦ প্রথম দিক : ছদ্মবেশী বিপদ ও কৃষ্ণবিহীন আনন্দ

আনন্দ বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় ও নিরাপদ বলে মনে হলেও কিন্ত যদি তা কৃষ্ণ যুক্ত বা কৃষ্ণস্মরণ যুক্ত না থাকে, তবে সেই আনন্দ যেকোনো মুহূর্তে ভয়ংকর বিপদে পরিণত হতে পারে।
এই পরিপেক্ষিতে আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অঘাসুর উদ্ধার লীলা এবং হস্তিনাপুরে পান্ডব এবং কৌরবদের মধ্যে পাশা খেলা দুটো প্রায় একই ধরনের আকস্মিক ঘটনার বাস্তবিক বিপরীত ফলাফল নিয়ে আলোচনা করব।

✦ দ্বিতীয় দিক : পাপী জীবের মুক্তি ও ভগবানের কৃপা

যেখানে দেখা যায়—পাপগ্রস্ত, ভক্তিহীন জীবও ভগবানের সান্নিধ্যে এসে কিভাবে মুক্তির অধিকারী হয়। এখানে প্রকাশ পায় ভগবানের দেহ, লীলা ও সান্নিধ্যের অপরিসীম মুক্তিদায়ক শক্তি।

অঘাসুর বধ লীলা

শ্রীমৎ ভাগবতমের দশম স্কন্দের দ্বাদশ অধ্যায়ে এই লীলাটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে।
বৃন্দাবনের নির্মল সকালে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সখা ও গোবৎসদের নিয়ে বনে প্রবেশ করেছেন। কাননের শোভা আর রাখাল বালকদের কলহাস্যে যমুনা তট মুখরিত। ঠিক সেই সময়ে সেখানে উপস্থিত হলো এক মহাভয়ঙ্কর দানব— অঘাসুর।

গর্গ সংহিতার দশম খন্ডের প্রথম অধ্যায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, এই অঘাসুর ছিল অতি শক্তিশালী এক অসুর। সে আসলে ছিল কংসের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং পুতনা ও বকাসুরের ভ্রাতা। পুতনা ও বকাসুরের মৃত্যুর পর কংসই তাকে প্রেরণ করেছিল শ্রীকৃষ্ণকে বন্দী করার জন্য। অঘাসুর ছিল অমিত শক্তিশালী শঙ্খাসুরের পুত্র। তার নাম ছিল অঘ। সে রূপে ছিল অত্যন্ত লাবণ্যময়, যেন সাক্ষাৎ দ্বিতীয় কামদেব। নিজের এই রূপ এবং যৌবনের অহংকারে সে ছিল অত্যন্ত মদমত্ত। একবার মলাচল (মালয়) পর্বতে ঋষি অষ্টাবক্র ধ্যানমগ্ন ছিলেন। আমরা জানি, ঋষি অষ্টাবক্রের শরীর আটটি স্থানে বক্র বা বাঁকা ছিল। অঘাসুর তার সেই অতুলনীয় রূপের অভিমানে ঋষির শারীরিক গঠন দেখে উপহাস ও বিদ্রূপ করতে শুরু করে। এতে ঋষি ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে অভিশাপ দেন যে, সে যেন একটি বিশাল অজগর সর্পে পরিণত হয়। এই অভিশাপের ফলেই সেই জন্মেই রূপবান অঘ এক কুৎসিত ও বিশাল সর্পে পরিণত হয়। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে অঘাসুর ক্ষমা প্রার্থনা করলে অষ্টবক্র মুনির হৃদয় করুণায় পূর্ণ হয় এবং তিনি আবার তাকে বরদান করেন যে কোটি কন্দর্পকান্তি যুক্ত স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন স্ব-ইচ্ছায় তার উদরে প্রবেশ করবেন তখনই তার এই সর্পরূপ থেকে মুক্তি ঘটবে এবং তার উদ্ধার হবে।

এই অঘাসুর নিজের দেহকে আট মাইল দীর্ঘ করে যমুনার তীরে শুয়ে ছিল। তার হাঁ করা মুখটি ছিল গুহার মতো। তার নিচের চোয়াল মাটির ওপর আর ওপরের চোয়াল আকাশস্পর্শী মেঘের মতো স্থির হয়ে রইল। তার গুহার মতো মুখ থেকে বিষাক্ত বাতাসের হলকা বের হচ্ছিল। শ্রীকৃষ্ণের সখারা একে বৃন্দাবনের এক বিস্ময়কর পাহাড়ের গুহা মনে করে খেলার ছলে তার পেটের ভেতর ঢুকে পড়ে। তাদের পেছনে পেছনে তাদের প্রিয় গোবৎসগুলোও চলে গেল। অন্তর্যামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারলেন এটি কালান্তক এক মরণফাঁদ। সখাদের বাঁচাতে তিনি নিজেও অঘাসুরের বিশাল মুখের ভেতর প্রবেশ করলেন।

কৃষ্ণ ভেতরে প্রবেশ করতেই অঘাসুর তার বিশাল মুখ বন্ধ করতে চাইল। কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শরীরের আকার অসীমভাবে বাড়াতে শুরু করলেন। এর ফলে অসুরটির শ্বাসরোধ হতে লাগল। প্রবল ছটফটানিতে তার প্রাণবায়ু মাথার ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে বের হয়ে গেল এবং অসুরটির মৃত্যু হলো।

তখনই শ্রীকৃষ্ণের অমৃতময় স্পর্শে এবং কৃপাদৃষ্টিতে অচৈতন্য সখা ও গোবৎসরা পুনরায় চেতনা ফিরে পেল। অসুর অঘাসুরের আত্মা এক জ্যোতির্ময় আলো হয়ে ভগবানের দেহে লীন হয়ে গেল, যা নির্দেশ করে যে এমনকি অতি পাপিষ্ঠ অসুরও ভগবানের হাতে নিহত হয়ে মোক্ষ লাভ করে।

অঘাসুর লীলা আমাদের শেখায়—

কৃষ্ণবিহীন আনন্দ যেকোনো সময়েই বিপদসংকুল হতে পারে, কিন্তু যে কোনো বিপদই পরম আনন্দময় হয়ে ওঠে যদি সর্বদা কৃষ্ণযুক্ত থাকা যায়।



📚 প্রাসঙ্গিক বই ও ভিডিও


Little Krishna Adventures

“Krishna and Aghasura – The Giant Serpent”


🎥 অঘাসুর লীলা (ভিডিও)

  • অঘাসুর উদ্ধার লীলা
  • এই ব্লগের ভিডিও ভার্সন — [পরবর্তীতে লিংক যুক্ত হবে]

পরবর্তী ও দ্বিতীয় অংশে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব—

ছদ্মবেশী আকস্মিক বিপদ রুপী অঘাসুর ও কৃষ্ণনির্ভর নির্ভয়তা

পড়ুন 

তৃতীয় ও অন্তিম অংশে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব—

অঘাসুরের মুক্তি, শ্রীকৃষ্ণের অহৈতুকী কৃপা ও ভক্তির অমৃতধারা

No comments:

Post a Comment

অঘাসুর লীলা : ছদ্মবেশী বিপদ ও ভক্তির অভয়তা | মাধবম অঘাসুর লীলা : দ্বিতীয় পর্ব ছদ্মবেশী বিপ...