শ্রী সনাতন গোস্বামী রচিত হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থে কার্তিক মাসের মাহাত্ম্য কীর্তন ও দামোদর ব্রত পালনের নিয়ম
শ্রীসনাতন গোস্বামী রচিত হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থটি বৈষ্ণবগণের জন্য একটি অত্যন্ত প্রামাণিক শাস্ত্র, যা বিভিন্ন ব্রত, উৎসব, পূজা পদ্ধতি এবং মাসগুলির মাহাত্ম্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে। এটি প্রধানত স্কন্দপুরাণ, পদ্মপুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ, ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ, বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ, নারদ পুরাণ এবং শ্রীমদ্ভাগবতম্ সহ বিভিন্ন পুরাণ ও শাস্ত্র থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করে বিধি-বিধান স্থাপন করে।
হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থে কার্তিক মাসকে বিশেষভাবে উর্জ্জ ব্রত মাস বা দামোদর মাস হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর মাহাত্ম্য অত্যন্ত উচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই গ্রন্থে কার্তিক মাসের মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে বিভিন্ন পুরাণ থেকে অসংখ্য শ্লোক উদ্ধৃত করা হয়েছে।
আমি নিচে হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থের কিছু অধ্যায় এবং সেখানে উল্লিখিত কার্তিক মাস বিষয়ক মূল বিষয়গুলির রেফারেন্স ও শ্লোকগুলি (বা শ্লোকের মূলভাব) তুলে ধরছি:
হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থে কার্তিক মাসের মাহাত্ম্য
হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থের ষোড়শ বিলাস (১৬শ অধ্যায়) সম্পূর্ণভাবে কার্তিক মাস ব্রত বা 'উর্জ্জ ব্রত' (ঊর্জ ব্রত) এর মাহাত্ম্য এবং পালন পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। এই অধ্যায়েই কার্তিক মাস বিষয়ক সমস্ত তথ্য কেন্দ্রীভূত।
১. কার্তিক মাসের সর্বশ্রেষ্ঠত্ব এবং দামোদর মাস রূপে পরিচিতি (ষোড়শ বিলাস):
হরিভক্তিবিলাস কার্তিক মাসকে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করে এবং এই মাসকে দামোদরের অত্যন্ত প্রিয় মাস হিসাবে তুলে ধরে।
রেফারেন্স: হরিভক্তিবিলাস, ষোড়শ বিলাস (১৬.১-৫) উদ্ধৃত পুরাণ: পদ্মপুরাণ, স্কন্দপুরাণ।
শ্লোক (উদাহরণ, পদ্মপুরাণ থেকে উদ্ধৃত):
"ন কার্তিকসমো মাসো ন কৃত্যং দামোদরপ্রিয়ম্। ন চ বেদসমং শাস্ত্রং ন তীর্থং গঙ্গয়া সমম্॥" (পদ্মপুরাণের এই শ্লোকটি হরিভক্তিবিলাসে উদ্ধৃত)
তাৎপর্য: এটি স্পষ্ট করে যে, কার্তিক মাসের সমান কোনো মাস নেই এবং এই মাস ভগবান দামোদরের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এটি পূর্বোক্ত আলোচনারই প্রতিফলন এবং হরিভক্তিবিলাস এটিকে প্রামাণিক বলে স্বীকার করে।
২. কার্তিক ব্রতের সাধারণ নিয়মাবলী ও ফল (ষোড়শ বিলাস):
হরিভক্তিবিলাস কার্তিক মাসে প্রাতঃস্নান, ব্রহ্মচর্য, হবিষ্যান্ন গ্রহণ, ভূমিতে শয়ন, অমিষ বর্জন এবং দীপদান ইত্যাদি ব্রতগুলির সাধারণ নিয়ম ও ফল ব্যাখ্যা করে।
রেফারেন্স: হরিভক্তিবিলাস, ষোড়শ বিলাস (১৬.১০-২০) উদ্ধৃত পুরাণ: স্কন্দপুরাণ, পদ্মপুরাণ, নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ।
শ্লোক (উদাহরণ, স্কন্দপুরাণ থেকে উদ্ধৃত):
"কার্তিকে প্রাতরুথ্থায় স্নাত্বা পুণ্যে সরিৎসলে। বিষ্ণোঃ পূজাং প্রকুর্বীত মুচ্যতে সর্বকিল্বিষাৎ॥" (স্কন্দপুরাণের এই শ্লোকটি হরিভক্তিবিলাসে উদ্ধৃত)
তাৎপর্য: এই শ্লোকটি কার্তিক মাসে সকালে উঠে পবিত্র নদীতে স্নান করে বিষ্ণু পূজা করার মাধ্যমে সকল পাপ থেকে মুক্তির কথা বলে। হরিভক্তিবিলাস এটিকে প্রাতঃস্নানের আবশ্যিকতা হিসাবে উল্লেখ করে।
৩. দীপদান মাহাত্ম্য (ষোড়শ বিলাস):
হরিভক্তিবিলাস কার্তিক মাসে দীপদানের বিশেষ গুরুত্ব বিশদভাবে আলোচনা করে, বিভিন্ন পুরাণ থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করে।
রেফারেন্স: হরিভক্তিবিলাস, ষোড়শ বিলাস (১৬.৬৯-১০৫)
উদ্ধৃত পুরাণ: স্কন্দপুরাণ, পদ্মপুরাণ।
শ্লোক (উদাহরণ, স্কন্দপুরাণ থেকে উদ্ধৃত):
"কার্তিকে দীপদানং যঃ কুরুতে বিষ্ণুসংনিধৌ। স সর্বপাপনির্মুক্তো বিষ্ণুলোকং স গচ্ছতি॥"
তাৎপর্য: এই শ্লোকটি দীপদানের মাধ্যমে পাপমোচন এবং বিষ্ণুলোক প্রাপ্তির কথা বলে। হরিভক্তিবিলাস এটিকে কার্তিক মাসের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হিসাবে নির্দেশ করে।
অন্য শ্লোক (উদাহরণ, পদ্মপুরাণ থেকে উদ্ধৃত):
"কার্তিকে দীপকো নিত্যং যেষাং গেহে প্রদীয়তে। তেষাং ন বিদ্যতে পাপং ন ভয়ং জন্মবর্গিষু॥"
অর্থ: "যাদের গৃহে কার্তিক মাসে প্রতিদিন প্রদীপ দান করা হয়, তাদের কোনো পাপ থাকে না এবং জন্মেও কোনো ভয় থাকে না।" তাৎপর্য: এই শ্লোকটি গৃহস্থদের জন্য কার্তিক মাসে প্রতিদিন প্রদীপ জ্বালানোর গুরুত্ব তুলে ধরে।
৪. তুলসী পূজা মাহাত্ম্য (ষোড়শ বিলাস):
হরিভক্তিবিলাসে তুলসী পূজা এবং তুলসী প্রদক্ষিণের অসীম ফলের কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
রেফারেন্স: হরিভক্তিবিলাস, ষোড়শ বিলাস (১৬.১৪২-১৮০) উদ্ধৃত পুরাণ: স্কন্দপুরাণ, পদ্মপুরাণ, গরুড় পুরাণ।
শ্লোক (উদাহরণ, স্কন্দপুরাণ থেকে উদ্ধৃত):
"তুলসীং সেবতে যো বৈ কার্তিকে মাসি নিত্যশঃ। স সর্বপাপনির্মুক্তো বিষ্ণুলোকং স গচ্ছতি॥"
তাৎপর্য: এই শ্লোকটি কার্তিক মাসে তুলসীর নিত্য সেবা ও পূজার মাধ্যমে পাপমোচন এবং বিষ্ণুলোক প্রাপ্তির কথা বলে।
৫. হরি কথা শ্রবণ ও সংকীর্তন (ষোড়শ বিলাস):
এই মাসে শ্রীহরির লীলাকথা শ্রবণ, নাম সংকীর্তন এবং ভাগবত পাঠের গুরুত্বও হরিভক্তিবিলাসে উল্লিখিত। রেফারেন্স: হরিভক্তিবিলাস, ষোড়শ বিলাস (১৬.২৩০-২৫০)
উদ্ধৃত পুরাণ: শ্রীমদ্ভাগবতম্, নারদ পুরাণ।
শ্লোক (উদাহরণ, নারদ পুরাণ থেকে উদ্ধৃত):
"কার্তিকে মাসি যে ভক্ত্যা শৃণ্বন্তি হরিকীর্তনম্। তে সর্বপাপনির্মুক্তা বৈষ্ণবত্বং লভন্তি হি॥"
অর্থ: "কার্তিক মাসে যে ভক্তরা ভক্তি সহকারে হরিকীর্তন শ্রবণ করে, তারা সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়ে বৈষ্ণবত্ব লাভ করে।" তাৎপর্য: এই শ্লোকটি কার্তিক মাসে হরিকীর্তন ও নামজপের গুরুত্ব তুলে ধরে।
৬. হবিষ্যান্ন গ্রহণ ও অমিষ বর্জন (ষোড়শ বিলাস):
কার্তিক মাসে হবিষ্যান্ন গ্রহণ এবং আমিষ খাদ্য পরিহারের মাধ্যমে সংযম পালনের বিধি বর্ণনা করা হয়েছে। রেফারেন্স: হরিভক্তিবিলাস, ষোড়শ বিলাস (১৬.২২-৩০) উদ্ধৃত পুরাণ: ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ।
তাৎপর্য: হরিভক্তিবিলাসের ষোড়শ বিলাসে কার্তিক মাসে ব্রত পালনকারীদের জন্য কোন কোন খাদ্য গ্রহণীয় এবং কোনটি বর্জনীয়, সে সম্পর্কে বিশদ আলোচনা রয়েছে, যা বিভিন্ন শাস্ত্র থেকে সংগৃহীত। এটি ব্রত পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ সাত্ত্বিক আহার মন ও শরীরকে শুদ্ধ রাখে এবং ভক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আমি হরিভক্তিবিলাস অনুযায়ী কার্তিক মাসে গ্রহণীয় ও বর্জনীয় খাদ্যদ্রব্যের একটি বিশদ আলোচনা উপস্থাপন করছি: হরিভক্তিবিলাস, ষোড়শ বিলাস (১৬শ অধ্যায়) অনুসারে কার্তিক মাসে গ্রহণীয় ও বর্জনীয় খাদ্য
হবিষ্যান্ন (গ্রহণীয় খাদ্য):
"হবিষ্যান্ন" বলতে সেই সকল খাদ্য বোঝায় যা যজ্ঞে আহুতি দানের যোগ্য বা ব্রতকালে গ্রহণীয়। এটি সাত্ত্বিক, নিরামিষ এবং সাধারণত কম মশলাযুক্ত ও সাধারণ খাদ্য হয়। কার্তিক মাসে নিম্নলিখিত খাদ্যগুলি গ্রহণীয়:
- চাল: সাধারণত আতপ চাল বা সিদ্ধ চাল (ক্ষেত্রবিশেষে) গ্রহণ করা যায়।
- ডাল: মুগ ডাল, মটর ডাল, তুর ডাল (অড়হর ডাল) ইত্যাদি। মসুর ডাল সাধারণত বর্জনীয়।
- শাকসবজি: আলু, কাঁচকলা, বেগুন (কিছু মতান্তরে), পটল, লাউ, কুমড়ো, কচু, মূলা, শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি।
- ফলমূল: সকল প্রকার সাত্ত্বিক ফলমূল গ্রহণীয়।
- দুগ্ধজাত দ্রব্য: দুধ, দই, ঘি (ননী থেকে তৈরি), মাখন।
- চিনি/গুড়: মিষ্টান্ন তৈরির জন্য ব্যবহার করা যায়।
বর্জনীয় খাদ্য:
কার্তিক মাসে ব্রত পালনকারীদের জন্য বেশ কিছু খাদ্যদ্রব্য কঠোরভাবে বর্জনীয়। এই খাদ্যগুলি সাধারণত তমোগুণী বা রজোগুণী, যা শরীর ও মনকে অস্থির করে এবং আধ্যাত্মিক সাধনার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
- আমিষ খাদ্য: মাছ, মাংস, ডিম, পেঁয়াজ, রসুন (এগুলি তামসিক খাদ্য হিসাবে পরিগণিত)।
- ডাল: মসুর ডাল, ছোলার ডাল (কিছু মতান্তরে বর্জনীয়), কলাই ডাল (উড়দ)।
- তেল: সরিষার তেল, তিলের তেল, রিফাইনড তেল (সাধারণত হবিষ্যান্নে ঘি বা স্বল্প পরিমাণ সূর্যমুখী তেল অনুমোদিত)।
- শাকসবজি: গাজর, বিট, লাল শাক (কিছু মতান্তরে), পুঁই শাক (কিছু মতান্তরে)।
- শস্য: পুরাতন ধান, যব (তবে, যব কিছু ক্ষেত্রে গ্রহণীয়ও বটে, এটি স্থানভেদে পরিবর্তিত)।
- তিতা ও কষা ফলমূল: তেঁতুল, আমলকী (তবে, আমলকী কিছু ব্রততে গ্রহণীয়, বিশেষত কার্তিক মাসে আমলকী নবমীর দিন পূজিত হয়, তাই এটি একটু জটিল)।
- মসলা: হিঙ (হিং), রাই, কটু (ঝাল) মশলা, অতিরিক্ত হলুদ, ধনে গুঁড়ো (কিছু মতান্তরে)।
- অন্যান্য: মদ্যপান, তামাক, চা, কফি, আফিম, গাঁজা - এই ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য কঠোরভাবে বর্জনীয়।
হরিভক্তিবিলাস এই খাদ্য তালিকাটি বিভিন্ন শাস্ত্রের নির্যাস থেকে প্রদান করেছে যাতে ভক্তরা কার্তিক মাসে সঠিক ভাবে ব্রত পালন করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হল দেহ ও মনকে শুদ্ধ রেখে ভগবানের প্রতি ভক্তি বৃদ্ধি করা। খাদ্য সংযমের মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়, যা আধ্যাত্মিক অনুশীলনের জন্য অত্যাবশ্যক। এই নিয়মগুলি সাধারণত ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং গুরুর নির্দেশ অনুসারে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, তবে উল্লিখিত তালিকাটি হরিভক্তিবিলাস অনুযায়ী কার্তিক মাসে ব্রত পালনকারীদের জন্য একটি সাধারণ ও প্রামাণিক নির্দেশিকা।
উপসংহার:
হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থটি কার্তিক মাসের মাহাত্ম্যকে অত্যন্ত প্রামাণিকভাবে উপস্থাপন করে, বিভিন্ন পুরাণ থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করে এর নিয়মাবলী, ফল এবং বৈষ্ণব ভক্তির গভীরতা ব্যাখ্যা করে। এটি মূলত স্কন্দপুরাণ ও পদ্মপুরাণের কার্তিক মাস বিষয়ক আলোচনাকে সুসংবদ্ধ এবং বৈଷ্ণব দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে। ষোড়শ বিলাস অধ্যায়টিই কার্তিক মাসের সমস্ত বিধি-বিধান এবং মাহাত্ম্যের কেন্দ্রবিন্দু।
🔹 পদ্ম পুরাণে বর্ণিত দামোদর বা কার্তিক মাস মাহাত্ম্য 🔹 রামায়ণ ও মহাভারতে বর্ণিত কার্তিক মাস মাহাত্ম্য 🔹 ব্রতের নিয়মাবলী ও হরি ভক্তি বিলাসে বর্ণিত দামোদর মাস মাহাত্ম্য
🔹 শ্রী দামোদর অষ্টকম স্তোত্র পাঠ ও অর্থ আলোচনা
📖 সূচিপত্রে ফিরে যান

No comments:
Post a Comment