Tuesday, November 18, 2025

কার্তিক মাস মাহাত্ম্য — মহাভারত, রামায়ণ, স্কন্দপুরাণ, পদ্মপুরাণ, দামোদর ব্রত ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্তিমূলক উপদেশ

মহাভারত ও রামায়ণে কার্তিক মাসের মাহাত্ম্য

মহাভারত ও রামায়ণের প্রেক্ষাপটে  কার্তিক মাস সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা


মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে (এবং কিছু সংস্করণে অনুশাসন পর্বেও এর অংশ পাওয়া যায়), যুধিষ্ঠির এবং ভীষ্মের মধ্যে যে কথোপকথন হয়, সেখানে ধর্মতত্ত্ব, ব্রত, দান এবং বিভিন্ন মাস-তিথির মাহাত্ম্য নিয়ে আলোচনা আছে। এই আলোচনাগুলির মধ্যে কার্তিক মাসের গুরুত্ব ও তার ফল সম্পর্কেও উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারতের এই অংশে ভীষ্ম, শরশয্যায় শায়িত অবস্থায় যুধিষ্ঠিরকে ধর্মোপদেশ দান করেন। এই উপদেশগুলি 'ভীষ্মোপদেশ' নামে পরিচিত। এই উপদেশগুলির মধ্যে কিছু জায়গায় কার্তিক মাসের মাহাত্ম্য উঠে এসেছে, বিশেষত প্রাতঃস্নান, দান এবং বিষ্ণু পূজার প্রসঙ্গে।

মহাভারত, আশ্বমেধিক পর্ব (ভীষ্ম-যুধিষ্ঠির সংবাদ): কার্তিক মাসের মাহাত্ম্য




মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে (সাধারণত অধ্যায় ৯৪-৯৬ বা তার কাছাকাছি, বিভিন্ন সংস্করণে অধ্যায় সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে), ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বিভিন্ন ব্রতের ফল এবং মাসের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে কার্তিক মাস বিশেষভাবে উল্লিখিত।

১. কার্তিক মাসের প্রাতঃস্নানের মাহাত্ম্য:

ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলছেন যে, কার্তিক মাসে পবিত্র নদীতে প্রাতঃস্নান করা অত্যন্ত পুণ্যদায়ক এবং এটি সকল পাপ নাশ করে। রেফারেন্স: মহাভারত, আশ্বমেধিক পর্ব, অধ্যায় ৯৪ (অথবা ৯৫, ভীষ্মোপদেশ পর্ব)।


শ্লোক (উদাহরণ, মূলভাব):

"কার্তিকে মাসি যো নিত্যং প্রাতঃস্নায়ী ভবেৎ নৃপ। সর্বপাপবিনির্মুক্তো বিষ্ণুলোকং স গচ্ছতি॥"

অর্থ: "হে রাজন! যে ব্যক্তি কার্তিক মাসে প্রতিদিন গঙ্গা ও যমুনার মতো পুণ্য সলিলা নদীতে প্রাতঃস্নান করে, সে সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়ে বিষ্ণুলোকে গমন করে।"

তাৎপর্য: এই শ্লোকটি কার্তিক মাসে প্রাতঃস্নানের মাধ্যমে পাপমুক্তি এবং বিষ্ণুলোক প্রাপ্তির কথা বলে। ভীষ্ম এই স্নানকে শারীরিক ও আত্মিক শুদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক বলে বর্ণনা করেছেন।

২. কার্তিক মাসে দান ও শ্রাদ্ধের ফল:

ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দিচ্ছেন যে, কার্তিক মাসে করা দান এবং পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধকর্ম বিশেষ ফলদায়ক। রেফারেন্স: মহাভারত, আশ্বমেধিক পর্ব, অধ্যায় ৯৫ (বা ৯৬, দান ও ব্রতফল বর্ণনা)।

শ্লোক (উদাহরণ, মূলভাব):

"দানং দত্ত্বা কার্তিকে মাসি ব্রাহ্মণায় বিশেষতঃ। তৎফলং শতসাহস্রং লভতে নাত্র সংশয়ঃ॥"

অর্থ: "কার্তিক মাসে বিশেষত ব্রাহ্মণকে দান করে, সেই ব্যক্তি নিঃসন্দেহে লক্ষগুণ ফল লাভ করে।" 

তাৎপর্য: এই শ্লোকটি কার্তিক মাসে দানের অসীম ফলকে তুলে ধরে। ভীষ্ম উল্লেখ করেছেন যে, এই মাসে ক্ষুধার্তদের অন্নদান বা বস্ত্রদান করলে তা অত্যন্ত পুণ্য দেয়।

৩. ভগবান শ্রী বিষ্ণু ও কার্তিক মাসের সম্পর্ক:

মহাভারত ভীষ্মের মুখ দিয়ে বর্ণনা করে যে, কার্তিক মাস ভগবান বিষ্ণুর কাছে অত্যন্ত প্রিয়, এবং এই মাসে বিষ্ণুপূজা করলে তিনি বিশেষভাবে প্রসন্ন হন। রেফারেন্স: মহাভারত, আশ্বমেধিক পর্ব, অধ্যায় ৯৪-৯৬।

শ্লোক (উদাহরণ, মূলভাব):

"প্রিয়ো হি ভগবান্ বিষ্ণুঃ কার্তিকে মাসি সর্বদা। তস্মাদ্ বিষ্ণুং সমভ্যর্চ্য মুচ্যতে সর্বকিল্বিষাৎ॥"

অর্থ: "ভগবান বিষ্ণু কার্তিক মাসে সর্বদা অত্যন্ত প্রিয় থাকেন। অতএব, বিষ্ণুর সম্যক অর্চনা করে (মনুষ্য) সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়।" 

তাৎপর্য: এই শ্লোকটি কার্তিক মাসকে বিষ্ণু আরাধনার জন্য শ্রেষ্ঠ সময় হিসাবে চিহ্নিত করে। ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে এই মাসে বিষ্ণু ভক্তির মাধ্যমে মোক্ষ লাভের উপদেশ দেন।

৪. হবিষ্যান্ন গ্রহণ ও ইন্দ্রিয় সংযম:

আশ্বমেধিক পর্বে, ভীষ্ম কার্তিক মাসে সংযম, হবিষ্যান্ন গ্রহণ এবং ব্রহ্মচর্য পালনের উপরও জোর দিয়েছেন, যা অন্যান্য পুরাণেও উল্লিখিত। রেফারেন্স: মহাভারত, আশ্বমেধিক পর্ব, অধ্যায় ৯৫ (ব্রত ও সংযম প্রকরণ)।

শ্লোক (মূলভাব): যে ব্যক্তি কার্তিক মাসে হবিষ্যান্ন গ্রহণ করে, ইন্দ্রিয় সংযম করে এবং ব্রহ্মচর্য পালন করে, সে অশেষ পুণ্য লাভ করে এবং সকল দুঃখ থেকে মুক্ত হয়।

মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে ভীষ্ম এবং যুধিষ্ঠিরের এই কথোপকথনগুলি কার্তিক মাসের ধর্মীয় গুরুত্বকে দৃঢ় করে। ভীষ্ম, তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে, এই মাসে স্নান, দান, বিষ্ণু পূজা এবং সংযম পালনের যে উপদেশ দিয়েছেন, তা পরবর্তীকালে বিভিন্ন পুরাণে আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মহাভারত প্রমাণ করে যে, কার্তিক মাসের মাহাত্ম্য প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ভগবান শ্রী কৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণী

মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক সরাসরি কার্তিক মাস মাহাত্ম্য বা ব্রত মাহাত্ম্য কথিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট এবং বিস্তারিত রেফারেন্স খুঁজে পাওয়া অপেক্ষাকৃত বিরল, বিশেষ করে ভীষ্মের মতো বিশদ উপদেশ আকারে। মহাভারতে সাধারণত ভীষ্ম, নারদ বা মার্কণ্ডেয় ঋষিরা ধর্মতত্ত্ব, ব্রত এবং তীর্থ মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ নিজে অবশ্য মহাভারতে অর্জুনকে কুরুক্ষেত্রের ময়দানে গীতার উপদেশ দিয়েছেন, যা কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তিযোগের সারমর্ম।

তবে, শ্রীকৃষ্ণ মহাভারতের বিভিন্ন অংশে ধর্মের ব্যাখ্যা করেছেন, এবং তার কিছু বক্তব্যকে কার্তিক মাসের ব্রত মাহাত্ম্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা যেতে পারে, বিশেষত ভক্তি এবং দানের ফলাফলের প্রসঙ্গে। সরাসরি "কার্তিক মাস মাহাত্ম্য" উল্লেখ না থাকলেও, তাঁর মুখ নিঃসৃত বাণীগুলির মধ্যে এর মূল ভিত্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

এখানে আমি দুটি সম্ভাব্য দৃষ্টিকোণ থেকে মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ কথিত বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরছি: মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ কথিত প্রাসঙ্গিক উক্তি (সরাসরি কার্তিক মাস মাহাত্ম্য উল্লেখ না থাকলেও)

১. ভগবদ্গীতা (ভক্তিযোগ ও কর্মফল):

শ্রীকৃষ্ণের মুখ নিঃসৃত ভগবদ্গীতা, মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত, ভক্তিযোগের চরম ব্যাখ্যা দেয়। কার্তিক মাসের ব্রত পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো ভক্তি বৃদ্ধি এবং ভগবানের প্রীতি লাভ। গীতার এই অংশটি এই ব্রতের আধ্যাত্মিক ভিত্তি প্রদান করে। রেফারেন্স: মহাভারত, ভীষ্মপর্ব, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, অধ্যায় ৯ (রাজবিদ্যা-রাজগুহ্যযোগ) এবং অধ্যায় ১২ (ভক্তিযোগ)। শ্লোক (উদাহরণ, ভক্তিযোগ):

"পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি। তদহং ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রয়তাত্মনঃ॥" (গীতা ৯.২৬)

অর্থ: "যে ভক্ত আমাকে ভক্তি সহকারে পত্র, পুষ্প, ফল, বা জল অর্পণ করে, সেই শুদ্ধাত্মার ভক্তিপূত অর্পণ আমি গ্রহণ করি।" 

তাৎপর্য: এই শ্লোকটি সরাসরি কার্তিক মাসের দীপদানের কথা না বললেও, এর মূলভাব কার্তিক মাসের ব্রতের সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। কার্তিক মাসে তুলসী, প্রদীপ, জল ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন, সামান্য কিছু ভক্তি সহকারে নিবেদন করলেই তিনি তা সানন্দে গ্রহণ করেন। এটি প্রমাণ করে যে, ব্রতগুলির মূল উদ্দেশ্য হল ভগবানের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন, যা কার্তিক মাসের ব্রত পালনেরও মূল ভিত্তি।

"সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ। অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ॥" (গীতা ১৮.৬৬)

অর্থ: "সকল ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমাকে আশ্রয় করো। আমি তোমাকে সকল পাপ থেকে মুক্ত করব, ভয় করো না।" 

তাৎপর্য: কার্তিক মাসে ব্রত পালনের অন্যতম ফল হলো পাপমুক্তি এবং মোক্ষলাভ। শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোকে বলছেন যে, তাঁর শরণাপন্ন হলে তিনি নিজেই সকল পাপ থেকে মুক্তি দেন। এখানে 'ধর্ম' শব্দটি মধ্য দিয়ে কর্তব্য কর্মের কথা বলা হয়েছে। কার্তিক মাসের ব্রত পালনের সময় অন্যান্য সকল জাগতিক কর্ম পরিত্যাগ করে  ভগবানের উদ্দেশ্য করা কর্তব্য বা কর্মের চরম ফলস্বরূপ মোক্ষপ্রাপ্তির প্রতি ইঙ্গিত করে।

২. দানের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ:

মহাভারতের বিভিন্ন স্থানে শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠির বা অন্যান্যদের দানের মাহাত্ম্য সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছেন। কার্তিক মাসে দানের বিশেষ গুরুত্ব আছে। যদিও সরাসরি 'কার্তিক মাসে দান' উল্লেখ না করলেও, দানের সাধারণ ফল সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণের উক্তিগুলি প্রাসঙ্গিক।

রেফারেন্স: মহাভারতের শান্তি পর্বে বা অনুশাসন পর্বে (যেখানে দানধর্মের বিশদ আলোচনা আছে), শ্রীকৃষ্ণের উক্তিগুলি পাওয়া যায়।

শ্লোক (উদাহরণ, মূলভাব, শান্তি পর্ব বা অনুশাসন পর্ব):

"দানেন সর্বং লভতে দানেন সর্বং জয়তে।"

অর্থ: "দানের দ্বারা সবকিছু লাভ করা যায়, দানের দ্বারা সবকিছু জয় করা যায়।"

তাৎপর্য: কার্তিক মাসে অন্নদান, বস্ত্রদান বা দীপদান করার যে মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি হলো দানের এই সাধারণ মাহাত্ম্য। শ্রীকৃষ্ণ এই উক্তিগুলির মাধ্যমে দানকে পুণ্যার্জনের একটি অন্যতম প্রধান পথ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।

৩. ধর্ম সংস্থাপন ও অধর্ম নাশ প্রসঙ্গে:

কার্তিক মাসকে ধর্ম পালনের জন্য শ্রেষ্ঠ মাস বলা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ সর্বদা ধর্ম সংস্থাপনের কথা বলেছেন। রেফারেন্স: ভগবদ্গীতা, অধ্যায় ৪ (জ্ঞানকর্মসন্ন্যাসযোগ)।

"পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥" (গীতা ৪.৮)

অর্থ: "সাধুদের পরিত্রাণ ও দুষ্কৃতকারীদের বিনাশের জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে আবির্ভূত হই।"

তাৎপর্য: কার্তিক মাসে ধর্ম পালন, ব্রত গ্রহণ, এবং পুণ্য অর্জন করার মাধ্যমে ভক্তরা ধর্মকে রক্ষা করেন এবং শ্রীকৃষ্ণের এই মহৎ উদ্দেশ্য পূরণে সাহায্য করেন।

মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ সরাসরি "কার্তিক মাস মাহাত্ম্য" বিষয়ক কোনো বিশদ আখ্যান বর্ণনা করেননি, যেমনটি ভীষ্ম বা অন্যান্য ঋষিরা করেছেন। তবে, তাঁর মুখ নিঃসৃত ভগবদ্গীতার উপদেশাবলী এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে তাঁর দেওয়া ধর্মোপদেশগুলি কার্তিক মাসের ব্রত পালনের আধ্যাত্মিক ভিত্তি এবং উদ্দেশ্যকে সমর্থন করে। ভক্তি, দান, পাপমুক্তি এবং ধর্ম পালন — এই সকল বিষয়গুলিই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাণীগুলিতে বারবার তুলে ধরেছেন, যা কার্তিক মাসের ব্রতগুলিরও মূল প্রতিপাদ্য।

অযোধ্যার দীপাবলি: শ্রী রামচন্দ্রের প্রত্যাবর্তন ও ভক্তির আলোকময় ফল



বহু যুগ আগের কথা। যখন পৃথিবীর বুকে অধর্মের ছায়া ঘনিয়ে এসেছিল, তখন ধর্ম সংস্থাপনের জন্য স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু শ্রী রামচন্দ্র রূপে অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র হয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাঁর জীবন ছিল ত্যাগ, প্রেম আর প্রতিজ্ঞাপালনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পিতার আদেশ পালনার্থে তিনি দীর্ঘ চৌদ্দ বছর বনবাসে কাটিয়েছিলেন। এই বনবাসকালে তিনি লঙ্কাধিপতি রাবণকে বধ করে অধর্মের বিনাশ ঘটিয়েছিলেন এবং ধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অবশেষে, সেই প্রতীক্ষিত শুভক্ষণ উপস্থিত হলো। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর পর, শ্রীরামচন্দ্র, তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী সীতা দেবী এবং অনুজ লক্ষণ ও ভক্ত হনুমানকে সঙ্গে নিয়ে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করলেন। আর সেই দিনটি ছিল কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথি।

অযোধ্যা নগরী তাঁর প্রিয় রাজপুত্রকে ফিরে পেয়েছিল। এতদিনের বিচ্ছেদ, শোক আর প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছিল। অযোধ্যার প্রজারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিল। তারা জানত না কীভাবে তাঁদের আনন্দ প্রকাশ করবে। রাজা বা মন্ত্রীদের কোনো নির্দেশ ছাড়াই, স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রত্যেক অযোধ্যাবাসী নিজের নিজের ঘর, বাড়ি, দোকানপাট এবং সমগ্র অযোধ্যা নগরীকে লক্ষ লক্ষ প্রদীপ দিয়ে সাজিয়ে তুলল। মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় ঝলমল করে উঠল সমগ্র অযোধ্যা। অন্ধকার বিদায় নিল, আর সেই স্থানে নেমে এলো ভক্তি আর আনন্দের এক উজ্জ্বল প্রবাহ। আকাশে তারা, আর নিচে অযোধ্যার পথে পথে প্রজ্বলিত দীপাবলি — সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য।

অযোধ্যাবাসী জানত না যে, শ্রীরামচন্দ্র কেবল একজন রাজা নন, তিনি স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর অবতার। তাঁরা শুধু তাঁদের প্রিয় রাজপুত্রকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা হয়ে, নিজেদের গভীর ভালোবাসা ও ভক্তি উজাড় করে প্রদীপ জ্বালিয়েছিল। এই দীপগুলি ছিল তাঁদের হৃদয় থেকে উৎসারিত ভক্তিরই বহিঃপ্রকাশ।

অযোধ্যাবাসীর সেই সরল ভক্তি ও নিবেদন দেখে স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র (যিনি বিষ্ণুরই অবতার) অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন। তাঁদের এই অকুণ্ঠ ভালোবাসা আর প্রজ্জ্বলিত লক্ষ লক্ষ প্রদীপের পুণ্য প্রভাবে, সমগ্র অযোধ্যাবাসী — ছোট, বড়, ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে — সকলেই পাপমুক্ত হয়ে বৈকুণ্ঠের পরম ধাম লাভ করল। অযোধ্যার সেই আনন্দময় প্রত্যাবর্তন উৎসবই আজ আমাদের কাছে দীপাবলি নামে পরিচিত।

উপসংহার: কার্তিক মাসের মহিমা ও ব্রতের পূর্ণতা

কার্তিক মাস কেবল তিথি, ব্রত বা উপবাসের সমষ্টি নয়। এই মাসটি হলো ভক্তি ও প্রেমের এক নিবেদন। মা যশোদার প্রেমডোরে বাঁধা দামোদরের লীলা থেকে শুরু করে, অনিচ্ছাকৃত দীপদানে ইঁদুরের রাজকন্যা হওয়া, তুলসী দেবীর অমর প্রেমগাথা, অথবা শ্রীরামের প্রত্যাবর্তনে অযোধ্যার আলোকোজ্জ্বল দীপাবলি — প্রতিটি কথা এই সত্যটিকেই প্রতিষ্ঠিত করে যে, প্রেম ও ভক্তি সহকারে করা যেকোনো পুণ্যকর্ম, তা যত সামান্যই হোক না কেন, কার্তিক মাসে অসীম ফল প্রদান করে এবং জীবকে পাপমুক্ত করে পরমগতি দান করে। এই মাসটি আমাদের শেখায় যে, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো হৃদয়ের শুদ্ধতা এবং ভগবানের প্রতি অটুট বিশ্বাস। কার্তিক মাস সেই অমৃতময় সুযোগ এনে দেয়, যখন আমরা ভক্তি আর প্রীতির আলো দিয়ে নিজেদের জীবনকে উদ্ভাসিত করতে পারি, আর ভগবানের কৃপায় লাভ করতে পারি পরম শান্তি ও মোক্ষ। এই মাসে প্রতিটি ব্রত, প্রতিটি দীপ, প্রতিটি তুলসী পাতা—সবকিছুই ভগবানের প্রতি আমাদের ভালোবাসার প্রতীক।



আরো পড়ুন
সূচিপত্র

🔹 দামোদর বা কার্তিক মাস কেন শ্রেষ্ঠ  🔹 শ্রীমতি রাধারানী, দামোদর লীলা ও দীপ দান মাহাত্ম্য 🔹 স্কন্দ পুরাণে বর্ণিত দামোদর বা কার্তিক মাস মাহাত্ম্য 
🔹 পদ্ম পুরাণে বর্ণিত দামোদর বা কার্তিক মাস মাহাত্ম্য  🔹 রামায়ণ ও মহাভারতে বর্ণিত কার্তিক মাস মাহাত্ম্য  🔹 ব্রতের নিয়মাবলী ও হরি ভক্তি বিলাসে বর্ণিত দামোদর মাস মাহাত্ম্য
🔹 শ্রী দামোদর অষ্টকম স্তোত্র পাঠ ও অর্থ আলোচনা
📖 সূচিপত্রে ফিরে যান

#KartikMaas #Mahabharata #Ramayana #Bhakti #Vishnu #Krishna #Deepabali #TulasiPuja #PitrTarpan #Devotion #Purana

No comments:

Post a Comment

অঘাসুর লীলা : ছদ্মবেশী বিপদ ও ভক্তির অভয়তা | মাধবম অঘাসুর লীলা : দ্বিতীয় পর্ব ছদ্মবেশী বিপ...