Saturday, January 31, 2026

অঘাসুর লীলা : ছদ্মবেশী বিপদ ও ভক্তির অভয়তা | মাধবম

অঘাসুর লীলা : দ্বিতীয় পর্ব

ছদ্মবেশী বিপদ ও ভক্তির অভয়তা

— আনন্দের ছদ্মবেশে আগত বিপদের মুখে শ্রীকৃষ্ণনির্ভর জীব —


(◆ প্রথম পর্বটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন)

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে অঘাসুর কোনো আকস্মিক আক্রমণকারী অসুর নন। তিনি উপস্থিত হন অজগরের রূপে—এমন এক ছদ্মবেশে, যা বাইরে থেকে ভয়ংকর নয়, বরং এক বিস্ময়কর গুহার মতো প্রতীয়মান হয়। এই ছদ্মবেশই অঘাসুর লীলাকে কেবল পৌরাণিক কাহিনি না রেখে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক গভীর উপমায় পরিণত করে।

অবশ্যই রক্ষিবে কৃষ্ণ, এই সরলতা ও বিশ্বাসই শরণাগতের ভক্তির পরীক্ষা

জীবনেও বহু বিপদ এভাবেই আসে—আনন্দ, নিরাপত্তা ও সুযোগের রূপ ধরে। মানুষ প্রায়শই বিপদের প্রকৃত রূপ না বুঝেই স্বেচ্ছায় তার মধ্যে প্রবেশ করে ফেলে। অঘাসুর এখানে সেই ছদ্মবেশী বিপদের প্রতীক

অঘাসুর লীলার প্রথম দিকটি আমাদের শেখায়— বিপদ সবসময় ভয়ংকর চেহারা নিয়ে আসে না।

অঘাসুরের ছদ্মবেশ : গুহার মতো বিস্তৃত অজগর

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০.১২.১৬

ইতি ব্যবস্যাজগরং বৃহদ্ বপুঃ
স যোজনায়ামমহাদ্রিপীবরম্।
বৃত্ত্বাদ্ভুতং ব্যাত্তগুহাননং তদা
পথি ব্যশেত গ্রসনাশয়া খলঃ॥

অর্থ :

এইরূপ সিদ্ধান্ত করে সেই দুষ্ট অসুর এক বিশাল অজগরের রূপ ধারণ করল। তার দেহ ছিল যোজনপ্রমাণ দীর্ঘ, মহান পর্বতের মতো। সে বিস্ময়কর গুহার ন্যায় মুখ খুলে পথের মাঝখানে শুয়ে রইল—সকলকে গ্রাস করার অভিপ্রায়ে।

এখানে “গুহা” কোনো আকস্মিক উপমা নয়। গুহা সাধারণত আশ্রয় ও বিশ্রামের প্রতীক, শিশুদের কাছে এক বৃন্দাবনের এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক আনন্দ ও খেলা এখান থেকে যাবে না জায়গা। কিন্তু অঘাসুর সেই আশ্রয়কেই পরিণত করেছে মৃত্যুফাঁদে। ঠিক যেমন জীবনের বহু আনন্দময় পরিস্থিতির মধ্যেই অদৃশ্য বিপদ লুকিয়ে থাকে।

গোপবালকদের দৃষ্টিভঙ্গি : ভয় নয়, বিস্ময়

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০.১২.১৮

দৃষ্ট্বা তং তাদৃশং সর্বে
মত্বা বৃন্দাবনপ্রিয়ম্।
ব্যাত্তাজগরতুণ্ডেন
হ্যৎপ্রেক্ষন্তে স্ম লীলয়া॥

অর্থ :

সেই দৃশ্য দেখে সকল গোপবাল মনে করল— এটি নিশ্চয়ই বৃন্দাবনের কোনো প্রিয় স্থান। অজগরের উন্মুক্ত মুখের দিকে তারা বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে রইল, সবকিছুই যেন তাদের কাছে এক লীলার মতো প্রতিভাত হচ্ছিল।

গোপবালকদের চোখে এই পরিস্থিতি ভয়ের নয়, কারণ তাদের চিত্ত ছিল কৃষ্ণযুক্ত। যেখানে কৃষ্ণ আছেন, সেখানে ভয় স্থায়ী হতে পারে না।

“কৃষ্ণ আমাদের সঙ্গে আছেন” — নির্ভয়তার মূল

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০.১২.২৪

অস্মান্ কিমন্ন গ্রসিতা নিবিষ্টা-
নয়ং তথা চেদ্ বকবদ্ বিনঙ্ক্ষ্যতি।
ক্ষণাদনেনেতি বীক্ষ্যোদ্ধসন্তঃ
বকার্যশন্মুখং করতাড়নৈর্যযুঃ॥

অর্থ :

গোপবালকরা বলল—“সে যদি আমাদের গ্রাস করে ফেলে, তবুও সে বকাসুরের মতোই বিনষ্ট হবে। কারণ শ্রীকৃষ্ণ তো আমাদের সঙ্গেই আছেন— তিনি এক মুহূর্তেই একে বিনাশ করবেন।”

এই নির্ভয়তার মূল কোনো সাহসিকতা নয়, বরং কৃষ্ণনির্ভরতা। এখানেই অঘাসুর লীলার সঙ্গে ভগবদ্গীতার সরাসরি যোগ স্থাপিত হয়।

ভগবদ্গীতা ৯.৩৪

মন্‌-মনা ভব মদ্‌-ভক্তো
মদ্‌-যাজী মাং নমস্কুরু ।
মাম্‌ এবৈষ্যসি যুক্ত্বৈবম্‌
আত্মানং মত্‌-পরায়ণঃ ॥

অর্থ :

আমাতে মন নিবিষ্ট করো, আমার ভক্ত হও, আমার পূজা করো ও আমাকে প্রণাম করো। এইভাবে আমাকেই পরম আশ্রয় মনে করলে, তুমি নিশ্চিতভাবেই আমার নিকট প্রাপ্ত হবে।

গোপবালকদের আচরণ এই শ্লোকেরই জীবন্ত প্রয়োগ। তারা বিপদের মধ্যে থেকেও ভীত নয়, কারণ তারা মনে মনে কৃষ্ণকেই আশ্রয় করে আছে।

ভগবদ্গীতা ১৮.৬৬–এর “সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য” বাক্যে ‘ধর্ম’ শব্দটি এখানে কোনো বাহ্যিক সামাজিক আচরণ নয়, বরং বিপদের মুখে মানুষের অন্তরে জন্ম নেওয়া আশঙ্কা,ভয় ও সংশয়কেই নির্দেশ করে। মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন সে নানা আত্মরক্ষামূলক মানসিক আশ্রয় গ্রহণ করে— সেই আশঙ্কা, ভয়, সংশয় এবং তা থেকে সৃষ্ট কর্মই এখানে পরিত্যাজ্য ধর্ম।

ভগবদ্গীতা ১৮.৬৬

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।

অর্থ (প্রসঙ্গভিত্তিক) :

সব রকম আশ্রয়—বিশেষ করে ভয় ও সংশয়— পরিত্যাগ করে আমাকেই একমাত্র শরণ হিসেবে গ্রহণ করো। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব— কোনো রকম সংশয় বা দ্বিধা করোনা।

এখানে ‘ধর্ম’ বলতে ভয় ও আত্মরক্ষার মানসিক আশ্রয় বোঝানো হয়েছে। ‘মা শুচঃ’ মানে—ভয়ের কারণে মনে কোনো সংশয় রেখো না। অঘাসুর লীলায় গোপবালকদের নির্ভয়তা এই শ্লোকেরই বাস্তব রূপ।

ভগবান বলেন—এই ভয় পরিত্যাগ করে আমাকেই একমাত্র শরণ গ্রহণ করো। এই কারণেই শ্লোকের শেষে তিনি বলেন— “মা শুচঃ”—অর্থাৎ কোনো রকম সংশয় বা দ্বিধা রেখো না। অঘাসুর লীলায় গোপবালকদের আচরণ এই শ্লোকেরই জীবন্ত প্রয়োগ; তারা ভয়কে আশ্রয় না করে একান্তভাবে কৃষ্ণের উপর নির্ভর করেছিল বলেই তারা ছিল সম্পূর্ণ নির্ভয়।

ভগবদ্গীতায় অভয় ও ভগবৎ-নির্ভরতা

ভগবদ্গীতা ১৬.১

অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ।
দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্।।

অর্থ :

অভয়তা, চিত্তের বিশুদ্ধতা, জ্ঞানযোগে স্থিতি, দান, সংযম, যজ্ঞ, স্বাধ্যায়, তপস্যা ও সরলতা— এই সকল গুণই দৈবী স্বভাবের লক্ষণ।

এই শ্লোক স্পষ্ট করে দেয়—অভয় কোনো আবেগ নয়, এটি একটি দৈবী গুণ। অঘাসুর লীলায় গোপবালকদের ভয়হীনতা এই দৈবী গুণেরই স্বাভাবিক প্রকাশ।

ভগবদ্গীতা ১৮.৬৫

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়ো’সি মে।।

অর্থ :

আমাতে মন নিবিষ্ট করো, আমার ভক্ত হও, আমার পূজা করো ও আমাকে প্রণাম করো। এইভাবে চললে তুমি নিশ্চিতভাবেই আমার নিকট আসবে— এটি আমার প্রতিশ্রুতি, কারণ তুমি আমার প্রিয়।

গোপবালকদের আচরণে এই শ্লোকের সরাসরি প্রয়োগ দেখা যায়— তাদের মন, আস্থা ও নির্ভরতা সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণে নিবদ্ধ ছিল।

জীব গোস্বামীর কৃষ্ণ-সন্দর্ভ : অভয় ও ভগবৎ-নির্ভরতার তাত্ত্বিক ভিত্তি


গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে জীব গোস্বামী তাঁর কৃষ্ণ-সন্দর্ভ গ্রন্থে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে শ্রীকৃষ্ণ কেবল পরমেশ্বরই নন, বরং তাঁর নাম, রূপ, গুণ, লীলা ও সান্নিধ্য—সবই চিন্ময় এবং স্বয়ং মুক্তিদায়ক।

এই কারণে জীব গোস্বামী স্পষ্টভাবে বলেন— শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মাত্রই (সরাসরি বা পরোক্ষভাবে), জীব ধীরে ধীরে বন্ধন থেকে মুক্তির পথে অগ্রসর হয়। এমনকি সেই জীবের মধ্যে যদি পূর্ণ ভক্তিভাব উপস্থিত না থাকেও, তবুও এই সংযোগ কখনো ব্যর্থ হয় না।

কৃষ্ণ-সন্দর্ভের সিদ্ধান্ত (সারার্থ):

কৃষ্ণের সান্নিধ্য কখনো নিরর্থক হয় না।

ভয়, সংশয় অথবা অজ্ঞানতাবশত হলেও যদি কেউ কৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে সেই সংযোগ শেষ পর্যন্ত মুক্তির দিকেই নিয়ে যায়।

এই তত্ত্বের আলোকে অঘাসুর লীলার প্রথম দিকটি আরও গভীরভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গোপবালকরা কোনো মানসিক কৌশলে ভয় দমন করার চেষ্টা করেনি; বরং তারা ছিল শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্যে অবস্থানরত

এই কারণেই ছদ্মবেশী অঘাসুরের মতো ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যেও তাদের অন্তরে ভয় স্থায়ী হতে পারেনি। এটাই জীব গোস্বামীর তত্ত্ব অনুযায়ী ভগবৎ-সান্নিধ্যজাত অভয়

অতএব, অঘাসুর লীলায় গোপবালকদের নির্ভয়তা কেবল লীলার আবেগ নয়; বরং কৃষ্ণ-সন্দর্ভে প্রতিষ্ঠিত ভক্তিতত্ত্বেরই বাস্তব প্রয়োগ।


ভগবানের নীরব সাক্ষীতা, জীবের স্বাধীনতা ও করুণাময় হস্তক্ষেপ


এই আলোচনার মধ্যে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম অথচ গভীর বিষয় লক্ষ্য করার মতো। শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে দেখা যায়, অঘাসুরের মুখে প্রবেশের ঠিক আগমুহূর্তে শ্রীকৃষ্ণ নিজে সামান্য পাশে সরে দাঁড়ান। গোপবালকরা তখন নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করে, বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিজেরাই সেই গুহার ভিতরে প্রবেশ করে।

শ্রীকৃষ্ণ সেখানে উপস্থিত থেকেও তাদের মতামতে হস্তক্ষেপ করেন না, না তাদের প্রবেশে বাধা দেন, না তৎক্ষণাৎ নিজে তাদের সঙ্গে গুহার ভিতরে প্রবেশ করেন। তিনি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন— একজন সাক্ষী হিসেবে।

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০.১২.২৫

ইত্থং মিথোহতথ্যমতজ্ঞভাষিতং
শ্রুত্বা বিচিন্ত্যেত্যমৃষা মৃষায়তে।
রক্ষো বিদিত্বাখিলভূতহৃৎস্থিতঃ
স্বানাং নিরোদুং ভগবান্ মনো দধে॥

অর্থ :

গোপবালকদের এই সরল ও ভয়হীন কথাবার্তা শুনে শ্রীকৃষ্ণ গভীরভাবে চিন্তা করলেন। তিনি সকল জীবের হৃদয়ে অবস্থানকারী— সবই তাঁর জানা। অতএব তিনি স্থির করলেন, এই মুহূর্তেই তিনি তাঁর সখাদের রক্ষা করবেন।

এখানে পরমাত্মা ও জীবের সম্পর্কের একটি মৌলিক তত্ত্ব প্রকাশ পায়। ভগবান কখনোই জীবের স্বাধীন ইচ্ছা বা স্বকর্মে জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করেন না। জীব নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করে— এমনকি সেই সিদ্ধান্ত যদি বিপদের দিকেও নিয়ে যায়।

তবুও, যখন ভগবান দেখেন যে জীবের অন্তরে আছে সরলতা, অহংকারশূন্যতা ও তাঁর প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাস, তখন তাঁর হৃদয় করুণায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। এই করুণাবশতই শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং অঘাসুরের মুখের ভিতরে প্রবেশ করেন এবং গোপবালকদের উদ্ধার করেন।

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০.১২.২৪

অস্মান্ কিমন্ন গ্রসিতা নিবিষ্টা-
নয়ং তথা চেদ্ বকবদ্ বিনঙ্ক্ষ্যতি।
ক্ষণাদনেনেতি বীক্ষ্যোদ্ধসন্তঃ
বকার্যশন্মুখং করতাড়নৈর্যযুঃ॥

অর্থ :

গোপবালকরা বলল— “সে যদি আমাদের গ্রাস করেও ফেলে, তবুও সে বকাসুরের মতোই বিনষ্ট হবে। কারণ কৃষ্ণ তো আমাদের সঙ্গেই আছেন।” এই বিশ্বাসে তারা আনন্দিত হয়ে কৃষ্ণের মুখের দিকে তাকিয়ে করতালি দিতে লাগল।

এই বিশ্বাসের মধ্যে কোনো আত্মগর্ব ছিল না, নিজেদের শক্তির উপর নির্ভরতার অহংকারও ছিল না। তাদের একমাত্র ভরসা ছিল— “কৃষ্ণই আমাদের রক্ষা করবেন।” ("অবশ্যই রক্ষীবে কৃষ্ণ") এই সরলতাই ভগবান তাঁর প্রিয়জনদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন।

হস্তিনাপুরে কৌরব ও পান্ডবদের পাশা সভা ও অঘাসুর লীলা
এক গভীর বৈপরীত্য

এই প্রসঙ্গে মহাভারতের পাশা সভার (দ্যুতক্রীড়া) ঘটনাটি একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তুলে ধরে। ইন্দ্রপ্রস্থ ত্যাগের আগে শ্রীকৃষ্ণ পান্ডবদের সতর্ক করেছিলেন, যে তারা যেন ধর্ম ও ধৈর্যের সাথে সবকিছু বিচার করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেন, তবুও পান্ডবরা নিজেদের সামর্থ্য, বীরত্ব ও রাজধর্মের উপর ভরসা করে সভায় উপস্থিত হন।

সেই সভায় একের পর এক তারা সর্বস্ব হারালেন। ঐশ্বর্য বীর্য যশ রাজ্যপাট সমস্ত রকম ধন যার ওপর তাদের অহংকার ছিল, সব তাদের খোয়া গেল ও তারা একদম নিঃস্ব হয়ে গেলেন। অথচ সেই মুহূর্তে নিজেদের শক্তির অহংকারে আচ্ছন্ন থাকার কারণে কারো মনেই প্রথমে শ্রীকৃষ্ণের নাম এল না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে বল ও শক্তি, ধর্ম ও ধনের অহংকার তাদের মধ্যে ছিল সেই বল ও শক্তি তাদের রক্ষার জন্য কোন কাজই আসলো না।

আসুন একবার দেখে নিই পান্ডবরা কি ক্ষমতায় বলীয়ান ছিল হস্তিনাপুরের দ্যুতক্রীড়ায় যাবার আগে

যুধিষ্ঠির:

যুধিষ্ঠির যখন ইন্দ্রপ্রস্থকে একটি সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত করেন, তখন নারদ মুনি তাঁকে তাঁর পিতা পাণ্ডুর বার্তা দেন যে, যুধিষ্ঠির যদি রাজসূয় যজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারেন, তবে পাণ্ডু ইন্দ্রের সভায় উচ্চস্থান লাভ করবেন।
যজ্ঞের আগে প্রধান বাধা ছিল মগধরাজ জরাসন্ধ। কারণ, জরাসন্ধকে পরাজিত না করে কেউ সম্রাট বা 'চক্রবর্তী' হতে পারতেন না। শ্রীকৃষ্ণের কৌশলে ভীম জরাসন্ধকে মল্লযুদ্ধে বধ করার পর যজ্ঞের পথ প্রশস্ত হয়। 
এরপর চার ভাই চার দিকে দিগ্বিজয়ে বের হন:

অর্জুন: উত্তর দিক জয় করেন।
ভীম: পূর্ব দিক জয় করেন।
সহদেব: দক্ষিণ দিক জয় করেন।
নকুল: পশ্চিম দিক জয় করেন।


এই যজ্ঞের ফলে যুধিষ্ঠিরের লাভ

১. সম্রাট বা চক্রবর্তী উপাধি: রাজসূয় যজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর যুধিষ্ঠির আর কেবল ইন্দ্রপ্রস্থের রাজা রইলেন না, তিনি আর্যাবর্তের 'একচ্ছত্র সম্রাট' হিসেবে স্বীকৃত হলেন। ভারতের সমস্ত ছোট-বড় রাজা তাঁকে কর প্রদান করতে বাধ্য হন।
২. পিতৃঋণ মুক্তি: নারদ মুনির কথামতো, এই যজ্ঞের মাধ্যমে যুধিষ্ঠির তাঁর প্রয়াত পিতা পাণ্ডুকে স্বর্গলোকে উচ্চতর মর্যাদা ও স্থান প্রদান করতে সক্ষম হন।
৩. ঐশ্বর্য ও সম্পদ: দিগ্বিজয় এবং যজ্ঞের উপহার হিসেবে পাণ্ডবরা অকল্পনীয় ধন-সম্পদ লাভ করেন। ময় দানব তাঁদের জন্য যে অপূর্ব 'ময় সভা' (মায়াবী রাজসভা) তৈরি করেছিলেন, তার খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
৪. ধর্মের প্রতিষ্ঠা: এই যজ্ঞে শ্রীকৃষ্ণকে 'অর্ঘ্য' প্রদানের মাধ্যমে (সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে) যুধিষ্ঠির জগৎকে বুঝিয়ে দেন যে পাণ্ডবরা ধর্মের পথে আছেন এবং শ্রীকৃষ্ণই তাঁদের পরম আশ্রয়।
এছাড়া যুধিষ্ঠির কেবল শারীরিক শক্তিতে নয়, বরং মানসিক এবং চারিত্রিক শক্তিতে বলীয়ান ছিলেন।
ধর্ম ও সত্যবাদিতা: তাঁকে বলা হয় 'ধর্মরাজ'। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সত্যনিষ্ঠা। কথিত আছে, তাঁর রথের চাকা সবসময় ভূমি থেকে চার আঙুল উপরে থাকত, কারণ তিনি কখনও মিথ্যে বলতেন না।
নীতি ও ন্যায়শাস্ত্র: শাসনকৌশল এবং ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। যক্ষপ্রশ্নের উত্তর দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে তাঁর ধৈর্য এবং শাস্ত্রজ্ঞান অতুলনীয়।
অস্ত্রচালনা: তিনি মূলত বর্শা (Spear) চালনায় দক্ষ ছিলেন। তবে তাঁর আসল শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তাঁর অটল ধৈর্য এবং শান্ত মস্তিষ্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

ভীম:
ভীম ছিলেন পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যে সবচেয়ে শারীরিক বলশালী এবং পরাক্রমশালী যোদ্ধা।

অতুলনীয় শারীরিক শক্তি: ভীমের দেহে দশ হাজার হাতির বল ছিল বলে মনে করা হয়। ছোটবেলায় তাঁকে বিষ খাইয়ে নদীতে ফেলে দেওয়া হলে তিনি নাগলোকে গিয়ে অমৃত পান করেছিলেন, যা তাঁর শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
গদাযুদ্ধ: ভীম ছিলেন সে সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ গদাযোদ্ধা।
মল্লযুদ্ধ: কুস্তি বা মল্লযুদ্ধে তাঁকে পরাজিত করার মতো কেউ ছিল না। জরাসন্ধ এবং কীচকের মতো মহাবীরদের তিনি শূন্য হাতেই বধ করেছিলেন।

অর্জুন:

অর্জুন ছিলেন একাধারে মহাবীর এবং শ্রীকৃষ্ণের পরম সখা। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তাঁর একাগ্রতা ও অস্ত্রবিদ্যায়।
ধনুর্বিদ্যা (Archery): অর্জুন ছিলেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর। দ্রোণাচার্যের প্রিয় শিষ্য হিসেবে তিনি লক্ষ্যভেদে ছিলেন অদ্বিতীয় (যেমন লক্ষ্যভেদে মাছের চোখ বিঁধানো)।
দিব্যাস্ত্রের অধিকারী: তিনি কঠোর তপস্যার মাধ্যমে অসংখ্য দিব্যাস্ত্র লাভ করেছিলেন। তাঁর ধনুকের নাম ছিল 'গাণ্ডীব'।
সব্যসাচী: অর্জুন দুই হাতে সমানভাবে ধনুক চালাতে পারতেন, তাই তাঁর নাম ছিল 'সব্যসাচী'।
একাগ্রতা: তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মনঃসংযোগ। যুদ্ধের ময়দানে লক্ষ্য ছাড়া তিনি আর কিছুই দেখতেন না।

নকুল

নকুল তাঁর অতুলনীয় রূপ এবং শারীরিক শক্তির জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর প্রধান পারদর্শিতাগুলো হলো:
অসিচালনা (Sword Fighting): নকুল ছিলেন পাণ্ডবদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ তরবারি যোদ্ধা। তাঁর তরবারি চালনার গতি এত বেশি ছিল যে বলা হতো বৃষ্টির মধ্যেও তিনি এমনভাবে তলোয়ার ঘোরাতে পারতেন যে এক ফোঁটা জলও তাঁর গায়ে লাগত না।
অশ্ববিদ্যা (Equine Science): অশ্বপালন, প্রশিক্ষণ এবং ঘোড়ার চিকিৎসাশাস্ত্রে নকুল ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি 'অশ্বচিকিৎসা' নামক একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন বলে মনে করা হয়।
বল ও তেজ: তিনি একজন মহারথী ছিলেন এবং যুদ্ধের ময়দানে তাঁর ক্ষিপ্রতা ছিল দেখার মতো।

সহদেব

সহদেব ছিলেন পাণ্ডবদের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত, জ্ঞানী এবং দূরদর্শী। তাঁর পারদর্শিতাগুলো হলো:
জ্যোতিষশাস্ত্র ও ত্রিকালজ্ঞ: সহদেব ছিলেন একজন অসাধারণ জ্যোতিষী। তিনি জানতেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরিণাম কী হবে, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের মায়ায় বা অভিশাপের ভয়ে তিনি তা আগে প্রকাশ করেননি। কথিত আছে, শকুনি নিজেও সহদেবের কাছে যুদ্ধের শুভক্ষণ জানতে গিয়েছিলেন।
গদা ও অসিচালনা: সহদেব গদাযুদ্ধে ভীমের মতো এবং অসিচালনায় নকুলের মতো দক্ষ ছিলেন।
গবাদি পশু পালন ও চিকিৎসা: পশুরোগ নিরাময়ে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল।
নীতিশাস্ত্র ও বুদ্ধি: যুধিষ্ঠিরের মতো তিনিও ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ এবং নীতিবান। শ্রীকৃষ্ণের মতে, সহদেবের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দেবতাদের গুরু বৃহস্পতির সঙ্গে তুলনীয়।

কিন্তু তার পঞ্চপতির বল, বীর্য, শৌর্য এবং পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোন ও কৃপাচার্যের উপস্থিতি ও তাদের বল প্রতাপ কোন কিছুই যখন কোন সাহায্যে আসলো না দ্রৌপদী তখন সকলকে ভর্ৎসনা করেছিলেন— এত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেন তারা তাঁকে রক্ষা করতে পারছে না? এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবীয় শক্তির সীমাবদ্ধতার কঠোর সত্য।

শেষ পর্যন্ত যখন দ্রৌপদী সব মানবীয় আশ্রয় ত্যাগ করে একান্তভাবে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করলেন, তখনই ভগবান তৎক্ষণাৎ হস্তক্ষেপ করলেন এবং তাঁকে রক্ষা করলেন।

অঘাসুর লীলায় যেখানে গোপবালকদের নিরহংকার ও কৃষ্ণনির্ভরতা তাদের নির্ভয় করেছিল, সেখানে পাশা সভায় অহংকার ও আত্মনির্ভরতা পান্ডবদের বিপর্যয়ের কারণ হয়েছিল।

এই দুইটি ঘটনা মিলিয়ে আমাদের শেখায়—
সামর্থ্য নয়, ভগবৎ-নির্ভরতাই প্রকৃত রক্ষা।



📚 প্রাসঙ্গিক বই ও ভিডিও


Little Krishna Adventures

“Krishna and Aghasura – The Giant Serpent”


🎥 অঘাসুর লীলা (ভিডিও)

  • অঘাসুর উদ্ধার লীলা
  • এই ব্লগের ভিডিও ভার্সন — [পরবর্তীতে লিংক যুক্ত হবে]

এই আলোচনায় আমরা ভক্তির আলোকে দেখলাম—

ছদ্মবেশী বিপদ, ভগবৎ-নির্ভর নির্ভয়তা,
জীবের স্বাধীনতা ও ভগবানের করুণাময় হস্তক্ষেপ

অঘাসুর লীলা আমাদের শেখায়— কৃষ্ণবিহীন আনন্দ বিপদসংকুল,
কিন্তু কৃষ্ণযুক্ত বিপদও পরম আনন্দময় ও মুক্তিদায়ক


তৃতীয় ও অন্তিম পর্বে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব—

অঘাসুরের মুক্তি, শ্রীকৃষ্ণের অহৈতুকী কৃপা
এবং পাপী জীবের পরম গতি

🔗 [এখানে তৃতীয় পর্বের লিংক যুক্ত হবে]


— পরমানন্দ মাধবম —

No comments:

Post a Comment

অঘাসুর লীলা : ছদ্মবেশী বিপদ ও ভক্তির অভয়তা | মাধবম অঘাসুর লীলা : দ্বিতীয় পর্ব ছদ্মবেশী বিপ...