(◆ প্রথম পর্বটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন)
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে অঘাসুর কোনো আকস্মিক আক্রমণকারী অসুর নন। তিনি উপস্থিত হন অজগরের রূপে—এমন এক ছদ্মবেশে, যা বাইরে থেকে ভয়ংকর নয়, বরং এক বিস্ময়কর গুহার মতো প্রতীয়মান হয়। এই ছদ্মবেশই অঘাসুর লীলাকে কেবল পৌরাণিক কাহিনি না রেখে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক গভীর উপমায় পরিণত করে।
জীবনেও বহু বিপদ এভাবেই আসে—আনন্দ, নিরাপত্তা ও সুযোগের রূপ ধরে। মানুষ প্রায়শই বিপদের প্রকৃত রূপ না বুঝেই স্বেচ্ছায় তার মধ্যে প্রবেশ করে ফেলে। অঘাসুর এখানে সেই ছদ্মবেশী বিপদের প্রতীক।
অঘাসুরের ছদ্মবেশ : গুহার মতো বিস্তৃত অজগর
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০.১২.১৬
ইতি ব্যবস্যাজগরং বৃহদ্ বপুঃ
স যোজনায়ামমহাদ্রিপীবরম্।
বৃত্ত্বাদ্ভুতং ব্যাত্তগুহাননং তদা
পথি ব্যশেত গ্রসনাশয়া খলঃ॥
অর্থ :
এখানে “গুহা” কোনো আকস্মিক উপমা নয়। গুহা সাধারণত আশ্রয় ও বিশ্রামের প্রতীক, শিশুদের কাছে এক বৃন্দাবনের এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক আনন্দ ও খেলা এখান থেকে যাবে না জায়গা। কিন্তু অঘাসুর সেই আশ্রয়কেই পরিণত করেছে মৃত্যুফাঁদে। ঠিক যেমন জীবনের বহু আনন্দময় পরিস্থিতির মধ্যেই অদৃশ্য বিপদ লুকিয়ে থাকে।
গোপবালকদের দৃষ্টিভঙ্গি : ভয় নয়, বিস্ময়
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০.১২.১৮
দৃষ্ট্বা তং তাদৃশং সর্বে
মত্বা বৃন্দাবনপ্রিয়ম্।
ব্যাত্তাজগরতুণ্ডেন
হ্যৎপ্রেক্ষন্তে স্ম লীলয়া॥
অর্থ :
গোপবালকদের চোখে এই পরিস্থিতি ভয়ের নয়, কারণ তাদের চিত্ত ছিল কৃষ্ণযুক্ত। যেখানে কৃষ্ণ আছেন, সেখানে ভয় স্থায়ী হতে পারে না।
“কৃষ্ণ আমাদের সঙ্গে আছেন” — নির্ভয়তার মূল
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০.১২.২৪
অস্মান্ কিমন্ন গ্রসিতা নিবিষ্টা-
নয়ং তথা চেদ্ বকবদ্ বিনঙ্ক্ষ্যতি।
ক্ষণাদনেনেতি বীক্ষ্যোদ্ধসন্তঃ
বকার্যশন্মুখং করতাড়নৈর্যযুঃ॥
অর্থ :
এই নির্ভয়তার মূল কোনো সাহসিকতা নয়, বরং কৃষ্ণনির্ভরতা। এখানেই অঘাসুর লীলার সঙ্গে ভগবদ্গীতার সরাসরি যোগ স্থাপিত হয়।
ভগবদ্গীতা ৯.৩৪
মন্-মনা ভব মদ্-ভক্তো
মদ্-যাজী মাং নমস্কুরু ।
মাম্ এবৈষ্যসি যুক্ত্বৈবম্
আত্মানং মত্-পরায়ণঃ ॥
অর্থ :
গোপবালকদের আচরণ এই শ্লোকেরই জীবন্ত প্রয়োগ। তারা বিপদের মধ্যে থেকেও ভীত নয়, কারণ তারা মনে মনে কৃষ্ণকেই আশ্রয় করে আছে।
ভগবদ্গীতা ১৮.৬৬–এর “সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য” বাক্যে ‘ধর্ম’ শব্দটি এখানে কোনো বাহ্যিক সামাজিক আচরণ নয়, বরং বিপদের মুখে মানুষের অন্তরে জন্ম নেওয়া আশঙ্কা,ভয় ও সংশয়কেই নির্দেশ করে। মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন সে নানা আত্মরক্ষামূলক মানসিক আশ্রয় গ্রহণ করে— সেই আশঙ্কা, ভয়, সংশয় এবং তা থেকে সৃষ্ট কর্মই এখানে পরিত্যাজ্য ধর্ম।
ভগবদ্গীতা ১৮.৬৬
সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।
অর্থ (প্রসঙ্গভিত্তিক) :
এখানে ‘ধর্ম’ বলতে ভয় ও আত্মরক্ষার মানসিক আশ্রয় বোঝানো হয়েছে। ‘মা শুচঃ’ মানে—ভয়ের কারণে মনে কোনো সংশয় রেখো না। অঘাসুর লীলায় গোপবালকদের নির্ভয়তা এই শ্লোকেরই বাস্তব রূপ।
ভগবান বলেন—এই ভয় পরিত্যাগ করে আমাকেই একমাত্র শরণ গ্রহণ করো। এই কারণেই শ্লোকের শেষে তিনি বলেন— “মা শুচঃ”—অর্থাৎ কোনো রকম সংশয় বা দ্বিধা রেখো না। অঘাসুর লীলায় গোপবালকদের আচরণ এই শ্লোকেরই জীবন্ত প্রয়োগ; তারা ভয়কে আশ্রয় না করে একান্তভাবে কৃষ্ণের উপর নির্ভর করেছিল বলেই তারা ছিল সম্পূর্ণ নির্ভয়।
ভগবদ্গীতায় অভয় ও ভগবৎ-নির্ভরতা
ভগবদ্গীতা ১৬.১
অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ।
দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্।।
অর্থ :
এই শ্লোক স্পষ্ট করে দেয়—অভয় কোনো আবেগ নয়, এটি একটি দৈবী গুণ। অঘাসুর লীলায় গোপবালকদের ভয়হীনতা এই দৈবী গুণেরই স্বাভাবিক প্রকাশ।
ভগবদ্গীতা ১৮.৬৫
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়ো’সি মে।।
অর্থ :
গোপবালকদের আচরণে এই শ্লোকের সরাসরি প্রয়োগ দেখা যায়— তাদের মন, আস্থা ও নির্ভরতা সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণে নিবদ্ধ ছিল।
জীব গোস্বামীর কৃষ্ণ-সন্দর্ভ : অভয় ও ভগবৎ-নির্ভরতার তাত্ত্বিক ভিত্তি
গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে জীব গোস্বামী তাঁর কৃষ্ণ-সন্দর্ভ গ্রন্থে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে শ্রীকৃষ্ণ কেবল পরমেশ্বরই নন, বরং তাঁর নাম, রূপ, গুণ, লীলা ও সান্নিধ্য—সবই চিন্ময় এবং স্বয়ং মুক্তিদায়ক।
এই কারণে জীব গোস্বামী স্পষ্টভাবে বলেন— শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মাত্রই (সরাসরি বা পরোক্ষভাবে), জীব ধীরে ধীরে বন্ধন থেকে মুক্তির পথে অগ্রসর হয়। এমনকি সেই জীবের মধ্যে যদি পূর্ণ ভক্তিভাব উপস্থিত না থাকেও, তবুও এই সংযোগ কখনো ব্যর্থ হয় না।
কৃষ্ণ-সন্দর্ভের সিদ্ধান্ত (সারার্থ):
কৃষ্ণের সান্নিধ্য কখনো নিরর্থক হয় না।
এই তত্ত্বের আলোকে অঘাসুর লীলার প্রথম দিকটি আরও গভীরভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গোপবালকরা কোনো মানসিক কৌশলে ভয় দমন করার চেষ্টা করেনি; বরং তারা ছিল শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্যে অবস্থানরত।
এই কারণেই ছদ্মবেশী অঘাসুরের মতো ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যেও তাদের অন্তরে ভয় স্থায়ী হতে পারেনি। এটাই জীব গোস্বামীর তত্ত্ব অনুযায়ী ভগবৎ-সান্নিধ্যজাত অভয়।
অতএব, অঘাসুর লীলায় গোপবালকদের নির্ভয়তা কেবল লীলার আবেগ নয়; বরং কৃষ্ণ-সন্দর্ভে প্রতিষ্ঠিত ভক্তিতত্ত্বেরই বাস্তব প্রয়োগ।
ভগবানের নীরব সাক্ষীতা, জীবের স্বাধীনতা ও করুণাময় হস্তক্ষেপ
এই আলোচনার মধ্যে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম অথচ গভীর বিষয় লক্ষ্য করার মতো। শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে দেখা যায়, অঘাসুরের মুখে প্রবেশের ঠিক আগমুহূর্তে শ্রীকৃষ্ণ নিজে সামান্য পাশে সরে দাঁড়ান। গোপবালকরা তখন নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করে, বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিজেরাই সেই গুহার ভিতরে প্রবেশ করে।
শ্রীকৃষ্ণ সেখানে উপস্থিত থেকেও তাদের মতামতে হস্তক্ষেপ করেন না, না তাদের প্রবেশে বাধা দেন, না তৎক্ষণাৎ নিজে তাদের সঙ্গে গুহার ভিতরে প্রবেশ করেন। তিনি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন— একজন সাক্ষী হিসেবে।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০.১২.২৫
ইত্থং মিথোহতথ্যমতজ্ঞভাষিতং
শ্রুত্বা বিচিন্ত্যেত্যমৃষা মৃষায়তে।
রক্ষো বিদিত্বাখিলভূতহৃৎস্থিতঃ
স্বানাং নিরোদুং ভগবান্ মনো দধে॥
অর্থ :
এখানে পরমাত্মা ও জীবের সম্পর্কের একটি মৌলিক তত্ত্ব প্রকাশ পায়। ভগবান কখনোই জীবের স্বাধীন ইচ্ছা বা স্বকর্মে জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করেন না। জীব নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করে— এমনকি সেই সিদ্ধান্ত যদি বিপদের দিকেও নিয়ে যায়।
তবুও, যখন ভগবান দেখেন যে জীবের অন্তরে আছে সরলতা, অহংকারশূন্যতা ও তাঁর প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাস, তখন তাঁর হৃদয় করুণায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। এই করুণাবশতই শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং অঘাসুরের মুখের ভিতরে প্রবেশ করেন এবং গোপবালকদের উদ্ধার করেন।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০.১২.২৪
অস্মান্ কিমন্ন গ্রসিতা নিবিষ্টা-
নয়ং তথা চেদ্ বকবদ্ বিনঙ্ক্ষ্যতি।
ক্ষণাদনেনেতি বীক্ষ্যোদ্ধসন্তঃ
বকার্যশন্মুখং করতাড়নৈর্যযুঃ॥
অর্থ :
এই বিশ্বাসের মধ্যে কোনো আত্মগর্ব ছিল না, নিজেদের শক্তির উপর নির্ভরতার অহংকারও ছিল না। তাদের একমাত্র ভরসা ছিল— “কৃষ্ণই আমাদের রক্ষা করবেন।” ("অবশ্যই রক্ষীবে কৃষ্ণ") এই সরলতাই ভগবান তাঁর প্রিয়জনদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন।
হস্তিনাপুরে কৌরব ও পান্ডবদের পাশা সভা ও অঘাসুর লীলা
এক গভীর বৈপরীত্য
এই প্রসঙ্গে মহাভারতের পাশা সভার (দ্যুতক্রীড়া) ঘটনাটি একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তুলে ধরে। ইন্দ্রপ্রস্থ ত্যাগের আগে শ্রীকৃষ্ণ পান্ডবদের সতর্ক করেছিলেন, যে তারা যেন ধর্ম ও ধৈর্যের সাথে সবকিছু বিচার করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেন, তবুও পান্ডবরা নিজেদের সামর্থ্য, বীরত্ব ও রাজধর্মের উপর ভরসা করে সভায় উপস্থিত হন।
সেই সভায় একের পর এক তারা সর্বস্ব হারালেন। ঐশ্বর্য বীর্য যশ রাজ্যপাট সমস্ত রকম ধন যার ওপর তাদের অহংকার ছিল, সব তাদের খোয়া গেল ও তারা একদম নিঃস্ব হয়ে গেলেন। অথচ সেই মুহূর্তে নিজেদের শক্তির অহংকারে আচ্ছন্ন থাকার কারণে কারো মনেই প্রথমে শ্রীকৃষ্ণের নাম এল না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে বল ও শক্তি, ধর্ম ও ধনের অহংকার তাদের মধ্যে ছিল সেই বল ও শক্তি তাদের রক্ষার জন্য কোন কাজই আসলো না।
আসুন একবার দেখে নিই পান্ডবরা কি ক্ষমতায় বলীয়ান ছিল হস্তিনাপুরের দ্যুতক্রীড়ায় যাবার আগে
যুধিষ্ঠির:
ভীম: পূর্ব দিক জয় করেন।
সহদেব: দক্ষিণ দিক জয় করেন।
নকুল: পশ্চিম দিক জয় করেন।
এই যজ্ঞের ফলে যুধিষ্ঠিরের লাভ
ভীম:
ভীম ছিলেন পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যে সবচেয়ে শারীরিক বলশালী এবং পরাক্রমশালী যোদ্ধা।
অর্জুন:
নকুল
সহদেব
কিন্তু তার পঞ্চপতির বল, বীর্য, শৌর্য এবং পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোন ও কৃপাচার্যের উপস্থিতি ও তাদের বল প্রতাপ কোন কিছুই যখন কোন সাহায্যে আসলো না দ্রৌপদী তখন সকলকে ভর্ৎসনা করেছিলেন— এত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেন তারা তাঁকে রক্ষা করতে পারছে না? এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবীয় শক্তির সীমাবদ্ধতার কঠোর সত্য।
শেষ পর্যন্ত যখন দ্রৌপদী সব মানবীয় আশ্রয় ত্যাগ করে একান্তভাবে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করলেন, তখনই ভগবান তৎক্ষণাৎ হস্তক্ষেপ করলেন এবং তাঁকে রক্ষা করলেন।
অঘাসুর লীলায় যেখানে গোপবালকদের নিরহংকার ও কৃষ্ণনির্ভরতা তাদের নির্ভয় করেছিল, সেখানে পাশা সভায় অহংকার ও আত্মনির্ভরতা পান্ডবদের বিপর্যয়ের কারণ হয়েছিল।
এই দুইটি ঘটনা মিলিয়ে আমাদের শেখায়—
সামর্থ্য নয়, ভগবৎ-নির্ভরতাই প্রকৃত রক্ষা।
📚 প্রাসঙ্গিক বই ও ভিডিও
Little Krishna Adventures
“Krishna and Aghasura – The Giant Serpent”
🎥 অঘাসুর লীলা (ভিডিও)
-
অঘাসুর উদ্ধার লীলা
- এই ব্লগের ভিডিও ভার্সন — [পরবর্তীতে লিংক যুক্ত হবে]
এই আলোচনায় আমরা ভক্তির আলোকে দেখলাম—
ছদ্মবেশী বিপদ, ভগবৎ-নির্ভর নির্ভয়তা,
জীবের স্বাধীনতা ও ভগবানের করুণাময় হস্তক্ষেপ
অঘাসুর লীলা আমাদের শেখায়—
কৃষ্ণবিহীন আনন্দ বিপদসংকুল,
কিন্তু কৃষ্ণযুক্ত বিপদও পরম আনন্দময় ও মুক্তিদায়ক।
তৃতীয় ও অন্তিম পর্বে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব—
অঘাসুরের মুক্তি, শ্রীকৃষ্ণের অহৈতুকী কৃপা
এবং পাপী জীবের পরম গতি
🔗 [এখানে তৃতীয় পর্বের লিংক যুক্ত হবে]
— পরমানন্দ মাধবম —

No comments:
Post a Comment