অঘাসুরের মুক্তি ও আধুনিক মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব
◆ পূর্ববর্তী পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আজকের যুগের মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু দুঃখ, অভাব বা ব্যর্থতা নয়— বরং অন্তরের অশান্তি, অনিশ্চয়তা এবং অর্থহীনতার এক গভীর অনুভূতি। মানুষ শান্তি ভালোথাকা বা ওয়েলনেসের খোঁজে কখনো মেডিটেশন, কখনো থেরাপি, কখনো নানা রকম মোটিভেশনাল টক এর আশ্রয় নিচ্ছে— তবুও মনে হয় কোথাও যেন কিছু অপূর্ণ থেকেই যাচ্ছে। অঘাসুর লীলা এই আধুনিক সংকটের এক আশ্চর্য প্রতিচ্ছবি।

আমরা অনেক সময় জীবনে কোনো না কোনোভাবে ঈশ্বর সম্পর্কে জানতে পারি এবং তার সংস্পর্শে আসতে পারি, তবুও দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে আমরা ব্যস্ত থাকি লাভ–ক্ষতির হিসাব কষতে। এমনকি দেব দেবী বা ঈশ্বরের প্রতি যে পূজা পাঠ প্রার্থনা সেটাও প্রায়শই হয় আমাদের জাগতিক চাওয়া–পাওয়া, কামনা–বাসনার পরিতৃপ্তির হিসাব নিয়ে। এই লাভের অংক যতক্ষণ মেলে, ততক্ষণ আমরা ঈশ্বরের নিকটবর্তী থাকি; আর সামান্য ক্ষতি বা অঘটন ঘটলেই অথবা যখন পরিস্থিতি বা ফল আমাদের অনুকূল না হয় আমরা তৎক্ষণাৎ ঈশ্বরের প্রতি বিরূপ হয়ে যাই, নিজেদের ভাগ্যকে দোষারোপ করি, ঈশ্বরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই, কখনো কখনো বৈরিতার পথেও চলে যাই। আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে কর্মফল বলে একটা বস্তু রয়েছে এবং তা প্রাপ্ত হওয়ার থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না। ইহ জন্মই হোক বা গত জন্মে ভালো কর্মের ফল ভালো পাওয়া যাবে এবং খারাপ কর্মের ফল খারাপ হিসেবেই আসবে।
কিন্তু এই হিসাবি সম্পর্কের মধ্যেই আমরা একটি গভীর সত্য ভুলে যাই— ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম দয়ালু, পরম কৃপালু। তাঁর করুণার কোনো পরিমাপ নেই। তিনিই এই জগতের পিতা-মাতা ধাতা এবং পিতামহ, তিনি বন্ধু সখা এবং ভাই বোন, আমাদের সবথেকে পরম আত্মীয়। মানুষ তাঁর জন্য কতটুকু করতে পারল, সেই হিসাব তিনি কষেন না; বরং কেউ যদি নিত্য তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, তাঁকে স্মরণ করতে পারে, তাঁকে খুঁজতে পারে— তা সে ভক্তির আনন্দেই হোক কিংবা জীবনের আর্ত অবস্থায় আশ্রয়ের খোঁজেই হোক— অপার করুণাময় ভগবান তাকে কখনো প্রত্যাখ্যান করেন না। শ্রীমদ্ভগবত গীতায় তিনি নিজেই বলেছেন যে, আর্ত হয়ে জীবনের অর্থের খোঁজে জিজ্ঞাসু হয়ে কেউ যদি তার কাছে আসেন অথবা জ্ঞানের দ্বারা বুঝতে চেষ্টা করে তার শরণাগত হন তাহলে শ্রীকৃষ্ণ তাদের প্রতি তার বিশেষ কৃপা দৃষ্টি রাখেন।
এইখানেই অঘাসুর লীলার গভীর শিক্ষা নিহিত। একজন পাপী, অভিশপ্ত, অসুর—যার জীবনে না ছিল সাধনা, না ছিল শুদ্ধ আচরণ— তবুও শুদ্ধ বৈষ্ণব কৃপায়, কেবল জাগতিক চাওয়া পাওয়ার জন্যই অবিচ্ছিন্ন কৃষ্ণ–চিন্তার মাধ্যমে সে এমন এক ভগবৎ সান্নিধ্য পায় যার আকাঙ্ক্ষায় যোগী ও তপস্বীরা যুগ যুগ ধরে তপস্যা ও সাধনা করেন।
এই পর্বে আমরা দেখব— কীভাবে শ্রীকৃষ্ণ–কেন্দ্রিক চেতনা (Krishna-consciousness) ভয়, অপরাধবোধ, হতাশা ও অস্তিত্বগত ক্লান্তি থেকে আধুনিক মানুষের অন্তরকে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তোলে। অঘাসুর লীলা এখানে কেবল পৌরাণিক কাহিনি নয়, বরং আজকের মানুষের জন্য এক গভীর inner wellness ও inner liberation–এর দর্শন।
অঘাসুরের মুক্তি — পাপী জীবের পরম গতি ও শ্রীকৃষ্ণের অহৈতুকী কৃপা
অঘাসুর লীলার দ্বিতীয় ও গভীরতর দিকটি প্রকাশ পায় তার পরিণতিতে— অঘাসুরের মুক্তিতে। এই অংশটি আমাদের সামনে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে:
অঘাসুর নামের মধ্যেই ‘অঘ’—অর্থাৎ পাপ—এই ভাবটি নিহিত। গর্গসংহিতায় আমরা পাই যে অঘাসুর ছিলেন অসুররাজ কংসের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের অন্তর্গত; সে ছিল অমিত ক্ষমতাশালী শঙ্খাসুরের বলিয়ান পুত্র, বকাসুরের ভ্রাতা ও পূতনার সহোদর ।
সে এক দিব্য রূপবান হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল, তার এই রূপ ও যৌবন ছিল বর্তমান জীবনের অন্যতম সম্পদ। গর্গসংহিতার বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর রূপ ছিল অত্যন্ত মনোহর— দ্বিতীয় কামদেবের ন্যায়। শৈশব থেকেই সে প্রবল শক্তিশালী ছিল এবং নানা পাপকর্মে লিপ্ত থাকতো। এই শক্তি ও সৌন্দর্য থেকেই তাঁর অন্তরে অহংকার জন্ম নেয়, যা ক্রমে তাঁর পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই অহংকারের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে যখন তিনি মলয়াচল পর্বতে অষ্টাবক্র মুনিকে তাঁর শারীরিক বিকৃতির জন্য পরিহাস করেন। এর ফলেই অষ্টাবক্র মুনি তাঁকে অভিশাপ দেন— তিনি কদাকার সর্পাকৃতি অজগরের রূপে পতিত হবেন।
পুতনা ও বকাসুরের সাথে পার্থক্য
পুতনা: তার মুক্তি ছিল কয়েক জন্ম আগের প্রতিশ্রুতির ফল (মহামতি রাজা বলির কন্যা রত্নমালা থেকে পুতনা)।
বকাসুর: বকাসুর পূর্বজন্মে ছিলেন দিতিপুত্র অসুরাজ হয়গ্রীবের পুত্র, উৎকল। এই উৎকল একবার জাজলি মুনির আশ্রমে গিয়ে ঋষিকে উপহাস করেছিলেন, যার ফলে তিনি বক (পাখি) হওয়ার অভিশাপ পান এবং পরে ওই ঋষির কাছেই ক্ষমাপ্রার্থনা করে সর্বেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হাতে মুক্তির পথ পান।
কিন্তু দুজনেই নতুন জন্মপ্রাপ্ত হওয়ায় সেই স্মৃতি তাদের ছিল না— অর্থাৎ তারা কেউই জানতেন না যে কৃষ্ণই তাদের মুক্তির একমাত্র অবলম্বন।
অঘাসুর : অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তির নিয়তি
অঘাসুরের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি ‘অভিশপ্ত জীবন’ থেকে মুক্তি। ঋষি অষ্টাবক্রের অভিশাপটি ছিল তার জন্য একটি কঠিন দণ্ড, কিন্তু পরবর্তীকালে এই অষ্টবক্র মুনিরই প্রদত্ত আশীর্বাদ—
এইভাবে তাকে সেই দণ্ড ভোগের মধ্য দিয়েই ভগবানের হাতে মুক্তির দ্বারে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, অভিশাপ পাওয়ার পর থেকে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বা নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের হাতে উদ্ধার পাওয়া।
কোনো মহান বৈষ্ণব বা মহৎ ঋষি যখন অভিশাপ দেন, তখন সেই অভিশাপের অন্তিমে ভগবৎ দর্শন বা মুক্তির পথও নির্ধারিত হয়ে যায়। অঘাসুরের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল।
তার অভিশপ্ত সর্প জীবনটি ছিল মূলত শ্রীকৃষ্ণের হাতে তার উদ্ধারের একটি মাধ্যম মাত্র। এর আগে আমরা দেখেছি মহান বৈষ্ণব নারদ মুনির অভিশাপে কুবেরের পুত্র নলকূবের ও মনিগ্রীবের ব্রজে যমল ও অর্জুন বৃক্ষ রূপে জন্ম, এবং শেষে ভগবৎ দর্শন ও শ্রীকৃষ্ণের স্পর্শে তাদের পুনরায় কুবের পুত্র হিসেবেই স্বরূপ প্রাপ্ত হওয়া।
একইভাবে অগস্ত্য ও দেবল ঋষির অভিশাপে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এবং গন্ধর্ব হুহুর যথাক্রমে গজেন্দ্র এবং কুমিরের রূপে জন্ম, এবং পরবর্তীকালে ভগবৎ দর্শন ও মুক্তি— এইসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে মহান বৈষ্ণবদের অভিশাপের বা আশীর্বাদের মধ্যেও তাদের অনুকম্পা ও করুণাই অন্তর্নিহিত থাকে যা ভগবত ভক্তি ও মুক্তির মার্গ কে প্রশস্ত করে ।
কুবেরপুত্র নলকূবর ও মণিগ্রীব — স্মৃতি, প্রতীক্ষা ও মুক্তির পথ
কুবেরপুত্র নলকূবর ও মণিগ্রীবের ঘটনাটি এখানে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত আছে— নারদ মুনির অভিশাপে তাঁরা যমল ও অর্জুন বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়ে গোকুলে দীর্ঘকাল অবস্থান করেছিলেন।
তাই বৃক্ষরূপে আবদ্ধ থেকেও তাঁদের অন্তরে কৃষ্ণস্মৃতি লুপ্ত হয়নি; বরং সেই স্মৃতিই তাঁদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার ও সাধনার ভিত্তি হয়ে ছিল। উখলের সঙ্গে বদ্ধ অবস্থায় থেকেও কুবেরের দুই পুত্রকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করে ভগবান তাদের পরম ভক্তে পরিণত করেছিলেন এবং তার চরণের অমৃত প্রেমভক্তি প্রদান করেছিলেন। তবে এখানে একটি বিষয় অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন শ্রী সত্যব্রত মুনি রচিত 'শ্রী দামোদর অষ্টকম স্তোত্রের' সপ্তম শ্লোক থেকে আমরা পাই যে কুবের পুত্ররা কিন্তু ভগবত দর্শন করেও তাদের মনে পার্থিব কোন কামনা বাসনা ছিলনা বরং তারা কেবল ভগবানের কাছে প্রেমভক্তি ভিক্ষা করেছিলেন, প্রকারান্তরে যা প্রাপ্ত হলে আর অন্য কোন জাগতিক চাওয়া পাওয়া অবশিষ্ট থাকে না।
অঘাসুরের সঙ্গে সূক্ষ্ম সাদৃশ্য
ঠিক এই ভাবেই অঘাসুরের ক্ষেত্রেও একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। অষ্টাবক্র মুনির অভিশাপে অঘাসুর অজগরের রূপে পতিত হলেও, সেই অভিশাপ ও আশীর্বাদের মধ্যেই তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল— কীভাবে তাঁর সর্পরূপমুক্তি ঘটবে।
ফলে অঘাসুরও নলকূবের–মণিগ্রীবের মতোই বহুকাল ধরে অপেক্ষা করেছিলেন— কবে শ্রীকৃষ্ণের সংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছবে, কবে তিনি জানতে পারবেন কোথায় কৃষ্ণ আছেন, আর মায়াচ্ছন্ন ছিলেন যদি জানতেও পারেন তাহলে কিভাবে স্বয়ং ভগবান তাঁর উদরের ভেতর স্ব-ইচ্ছায় প্রবেশ করবেন!
নলকুবের ও মনিগ্রীবের সঙ্গে তার পার্থক্য এই যে দুই কুবের পুত্র শ্রীকৃষ্ণের ভক্তরূপে তাঁর প্রেমভক্তি ও শরণাগতি কামনা করে সেই বৃক্ষরূপ অবস্থাতেও তাঁর জন্য তপস্যা এবং স্পর্শের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিল।
আর অঘাসুর তার সহজাত আসুরিক স্বভাবও পরিত্যাগ করেনি বা ভগবানের শরণাগতিও কামনা করেননি। সে শুধুমাত্র তার যৌবন এবং অপরূপ সৌন্দর্য ফিরে পাওয়া লালসায় শ্রীকৃষ্ণের প্রতীক্ষা করেছেতার খোঁজ করেছে।
সে জেনেই গেছিল যে শ্রীকৃষ্ণ বাদে অন্য কেউ তাকে কুরূপ থেকে মুক্ত করতে পারবে না, আর ততদিন তার এই শরীর থেকে মৃত্যুও ঘটবে না। তাই সে আরো বেশি উদ্ধত এবং দেবতাদেরও ত্রাস হয়ে উঠেছিল।
অষ্টবক্র মুনির প্রসাদে সে যে সুযোগ লাভ করেছিল ভক্তি এবং শরণাগতির পথে চলে ভগবানের ভক্ত হওয়ার সেই দুর্লভ সুযোগের সে সদ্ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু তা না করে সে শুধু তার জাগতিক কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার প্রচেষ্টার মধ্যেই নিজেকে আবদ্ধ করে রেখেছিল।
গজেন্দ্র–কুমির : স্মৃতিহীন মুক্তির দৃষ্টান্ত
এখানে শ্রীমদ্ভাগবতমে অষ্টম স্কন্দের তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত গজেন্দ্র মোক্ষম স্তোত্রে গজেন্দ্র–কুমিরের ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক দৃষ্টান্ত প্রদান করে। অগস্ত্য মুনির অভিশাপে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পরজন্মে গজেন্দ্র রূপে জন্মগ্রহণ করেন, এবং দেবল ঋষির অভিশাপে গন্ধর্ব হুহু কুমিররূপে রূপান্তরিত হন।
এই দুইজনই তাঁদের পূর্বজন্মের স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলেন। ফলে গজেন্দ্র ও কুমির— উভয়েই নিজেদের মুক্তির পথ ভুলে গিয়েছিলেন।
অর্থাৎ এখানে মুক্তি সচেতন স্মৃতির মাধ্যমে আসেনি। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পশু (হস্তি) যোনি প্রাপ্ত হয়েও একদম শেষে তার পশুর স্বভাব ত্যাগ করে ভক্ত রূপে ভগবানের শরণাগতি এবং কুমিরের (গন্ধর্ব হুহু) বন্ধন থেকে মুক্তি কামনা করেছিল।
ভক্ত রূপে তার পূর্বজন্মের লব্ধিত পুণ্য এবং গজেন্দ্র রূপে আর্ত প্রার্থনা তাকে ভগবানের অমৃতময় চরণ কমলের নিত্য সেবক— বৈকুণ্ঠের বিষ্ণুপদ প্রাপ্ত করিয়েছে।
অঘাসুর : স্মৃতিসহ অবিচ্ছিন্ন কৃষ্ণচিন্তা
অঘাসুরের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। সচেতন স্মৃতির সুযোগ পেয়েও সে তার আসুরিক স্বভাব পরিত্যাগ করতে অসমর্থ্য হয়েছিল। তিনিও নলকূবের–মণিগ্রীবের মতোই জানতেন — তাঁর শ্রীকৃষ্ণ সাক্ষাৎ নির্দিষ্ট।
পাপী ও অসুর স্বভাবের বশবর্তী হয়ে শুধু নিজের জাগতিক কামনা-বাসনা পূরণের জন্য তিনি শয়নে, বসনে, মননে সর্বদা কৃষ্ণচিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন। এই চিন্তা জাগতিক হলেও তা ছিল নিরন্তর।
তিনি সর্বদা অপেক্ষা করতেন— কখন কৃষ্ণের কোনো সংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছবে, কখন তিনি জানতে পারবেন কোথায় কৃষ্ণ অবস্থান করছেন।
ভগবদ্গীতা ১৮.৬৫
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়ো’সি মে॥
অর্থ :
যে ব্যক্তি সর্বদা মনে মনে আমাকে স্মরণ করে,
আমার ভক্ত হয়, আমার পূজা করে
এবং আমাকে প্রণাম করে—
সে নিশ্চিতভাবেই আমার নিকট প্রাপ্ত হয়।
কংস ও অঘাসুর : জ্ঞান থেকে ভিন্ন পথ
এখানে আবার কংস ও অঘাসুরের মধ্যে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সাদৃশ্য ও পার্থক্য লক্ষ্য করার মতো। সাদৃশ্য এই যে দু’জনেই জানত— তাদের শ্রীকৃষ্ণের সাথে সাক্ষাৎ নির্ধারিত।
কিন্তু এই জ্ঞান থেকেই তাদের পথ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
কংস প্রথম থেকেই জানতে পেরেছিল— দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানই তার মৃত্যুর কারণ। পরবর্তীকালে সে এটাও জানতে পারে যে সেই শিশুর নাম কৃষ্ণ।
কিন্তু এই জ্ঞান কংসের মনে ভক্তি জাগায়নি; বরং জাগিয়েছিল আতঙ্ক ও বিদ্বেষ। সেই মুহূর্ত থেকে কংস একের পর এক পরিকল্পনা করতে থাকে— কীভাবে কৃষ্ণকে হত্যা করা যায়।
পুতনা, শকটাসুর, তৃণাবর্ত, বকাসুর, অঘাসুর, অরিষ্টাসুর— একের পর একজন অসুরকে সে কৃষ্ণের কাছে প্রেরণ করেছে কেবল এক উদ্দেশ্যে— কৃষ্ণকে হত্যা করে নিজের মৃত্যুকে প্রতিহত করা, অমর হওয়া।
অঘাসুরের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন
অঘাসুরও জানতে পেরেছিল—তার সর্প রূপ থেকে মুক্তি শ্রীকৃষ্ণের হাতেই নিহিত। কিন্তু সে কৃষ্ণকে খুঁজে বেড়ায়নি বা শরণাগতি কামনা করেনি কারণ তার মধ্যে তখনো ক্ষমতা বা শক্তির অহংকার ছিল।
সে শ্রীকৃষ্ণের জন্য অপেক্ষা করেছে ঠিকই কিন্তু জাগতিক কামনা পূর্তির আশায়। সে জানত—শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং স্ব-ইচ্ছায় তার কাছে আসবেন। তাই সে নিজে কোনো পরিকল্পনা করেনি, বরং উল্টে এটা বলাই যায় যে সে ধন্ধে ছিল— ব্যাপারটা কি রকম ভাবে সম্ভব হবে!
অর্থাৎ তার নিজের কষ্ট, যে কুরুপ থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায় এবং যে শর্তটা অষ্টবক্র মুনি তাকে দিয়েছেন যে স্বয়ং সর্বস্বের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার উদরের মধ্যে স্ব-ইচ্ছায় প্রবেশ করলে পর তার এই কুরূপ ঘুচবে— সেটা কি রকম ভাবে পূরণ হবে!
কেমন করে আর কেনই বা স্বয়ং ভগবান স্বেচ্ছায় তার মত কদাকার এক সর্পের মুখে বা উদরে প্রবেশ করবেন? এই রকম ভাবে স্বীয় কষ্ট নিরাময়, পুনরায় কামদেব সম রূপ ও যৌবন প্রাপ্তির বাসনা এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কবে, কোথায় ও কিভাবে তার উদরে প্রবেশ করবেন ও তাকে এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত করবেন— এই সকল আশা আশঙ্কার কৃষ্ণ-যুক্ত চিন্তায় সে সর্বদা নিমজ্জিত থাকত।
তার সামনে সকল বস্তুকেই সে কৃষ্ণ ভাবতো এবং উদরস্ত করেও দেখতো যে সত্যিই তার রূপ পরিবর্তন হচ্ছে কিনা! এইভাবে অজান্তেই সে সর্ববস্তুতেই কৃষ্ণ দর্শন এবং কৃষ্ণ চিন্তা করতে থাকতো।
ভগবদ্গীতার আলোকে অঘাসুরের আর্ত কৃষ্ণচিন্তা
ভগবদ্গীতা ৭.১৬
চতুর্বিধা ভজন্তে মাং জনাঃ সৃকৃতিনোহর্জুন।
আর্তো জিজ্ঞাসুরর্থাথী জ্ঞানী চ ভরতর্ষভ।।
অনুবাদ :
হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন!
আর্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাসু ও জ্ঞানী—
এই চার প্রকার পুণ্যকর্মা ব্যক্তিগণ আমার ভজনা করেন।
এখানে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে অঘাসুরের এই কৃষ্ণ খোঁজ আসলে তার আর্ত অবস্থার ফল।
আর এই নিরন্তর নিজের লাভের জন্য হলেও কৃষ্ণ চিন্তা ধীরে ধীরে তাঁকে ভগবানের কৃপা পাওয়ার যোগ্য করে তুলেছিল।
ভগবদ্গীতা ৯.৩২
মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য যে’পি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ।
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাস্তে’পি যান্তি পরাং গতিম্॥
অর্থ :
হে পার্থ, যারা আমাকে বিশেষভাবে আশ্রয় গ্রহণ করে,
তারা স্ত্রী, বৈশ্য, শূদ্র বা পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করলেও
অবিলম্বে পরম গতি লাভ করে।
অঘাসুর যেন ভগবানের এই প্রতিশ্রুতিরই এক উজ্জ্বল প্রমাণ। তিনি পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, অসুরস্বভাব লালন করেছিলেন, তবুও শুধুমাত্র অবিচ্ছিন্ন কৃষ্ণচিন্তার কারণে— তা শত্রুভাবেই হোক— ভগবানের কৃপা লাভ করেন।
অহংকার, কৃপা ও মুক্তির দ্বার
অঘাসুরের কাহিনী আমাদের শেখায় যে অহংকার বর্তমান জীবনের অর্জিত শ্রেষ্ঠত্বকেও ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, কিন্তু অনুশোচনা বা ভগবৎ কৃপা সেই অন্ধকার থেকেও মুক্তির পথ দেখায়।
অঘাসুর লীলা একদিকে যেমন শুদ্ধ ভক্তের প্রেম ভক্তির নিদর্শন, সেরকম পাপী জীবের কামনা যুক্ত ঈশ্বর চিন্তা ও সর্বপাপহারী জনার্দন ভগবান শ্রী মুকুন্দের ভক্তের কথার মর্যাদা রক্ষা করতে পাপী জীবের উপর অহৈতুকি কৃপা প্রদর্শনও দর্শায়।
কংস, প্রতিশোধ ও অঘাসুরের দ্বন্দ্ব
এরপরের ঘটনাক্রম আবার তার মানসিক অবস্থায় এক ব্যাপক পরিবর্তন আনে। তার বোন পুতনা ও ভাই বকাসুরের মৃত্যুসংবাদ যেমন তাঁকে একদিকে কৃষ্ণ খোঁজ এনে দেয় সেরকম অপরদিকে তাকে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ন করে তোলে।
কিন্তু নিজের কামনা পূর্তির আশায় সে তৎক্ষণাৎ কৃষ্ণকে আক্রমণ করেনি। মায়াপতি মুকুন্দের দূরতিক্রমনিয়া মায়ার জালে সে অদ্ভুত এক দোটানায় পড়ে গেল।
এতদিন সে শ্রীকৃষ্ণের খোঁজে ছিল আর এখন যখন খোঁজ পাওয়া গেল সে দেখল যে এই ছোট্ট বালক কৃষ্ণের হাতে তার প্রিয় বোন ও ভাই এর মৃত্যু ঘটেছে। আর ব্রজবাসীগণ ছোট্ট কৃষ্ণের এই ক্রিত্যতে বেশ আনন্দিত এবং উৎফুল্ল হয়ে জীবন যাপন করছে, তাকে মাথায় করে রেখেছে, তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এই কৃষ্ণ।
সে ভেবে উঠতে পারছিল না— সে কি করবে, কিভাবে সে নিজের এই লজ্জাকর করূপ অবস্থার পরিবর্তন করবে, কিংবা কোনটা তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ— নিজে কামদেব সম রূপ ফিরে পাওয়া, নাকি নিজের ভাই ও বোনের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া, কৃষ্ণ ও ব্রজবাসীদের উচিত শিক্ষা দেওয়া!
কংসের আদেশ ও ছলের পরিকল্পনা
এরপর সেই সময় উপস্থিত হলো যখন কংস তাকে বৃন্দাবনে কৃষ্ণ বধের উদ্দেশ্যে যাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে এলো। সে বুঝে গেল, এতদিনে তার বহু প্রতীক্ষিত আশা পূরণ হওয়ার সময় এসে গিয়েছে।
কংসের আদেশ ও ছলের পরিকল্পনা
কিন্তু তখনও সে হঠাৎ আক্রমণ করেনি। বকাসুর যেরকম তৎক্ষণাৎ আক্রমণ করেছিল, অঘাসুর কিন্তু অপেক্ষা করেছে।
একই আঘাতে দুটি উদ্দেশ্য সাধন—
নিজের কুরূপ থেকে মুক্তি এবং তার বোন ও ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ— পূর্ণ করার পরিকল্পনা করে ছলের মাধ্যমে নিজের প্রতিহিংসা ও কামনা পূরণের একটি অভিনব অদ্ভুত উপায় সে বার করেছে।সে জানত—তার কাজ কৃষ্ণকে সরাসরি হত্যা করা নয়, বরং যেকোনো প্রকারে শ্রীকৃষ্ণকে তার মুখের ভেতর নিয়ে আসতে হবে।
তার ক্ষমতার প্রতি অহংকার এতটাই বেশি ছিল যে সে জানতো— যদি সে কৃষ্ণকে একবার নিজের মুখের ভেতর প্রবেশ করাতে পারে তবে নিজের শক্তি দিয়ে সে তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে পারবে।
এইভাবে একদিকে সে প্রতিশোধ নেবে, অন্যদিকে অষ্টবক্র মুনির আশীর্বাদও পূরণ হবে এবং সে আবার তার সুন্দর রূপবান শরীরও ফিরে পাবে। এই অন্তর্লীন কামনা সে অন্যকে বুঝতে দেয়নি— এমনকি কংসকেও নয়।
বৃন্দাবনে অঘাসুরের আগমন ও সংকল্প
বৃন্দাবনে এসে আনন্দরত শ্রীকৃষ্ণ এবং তার বন্ধুদের দেখে অঘাসুরের অন্তঃকরণে প্রতিশোধের আগুন আরো বেশি করে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠলো।
শ্রীমদ্ভাগবতম ১০.১২.১৪
দৃষ্টার্ভকান্ কৃষ্ণমুখানঘাসুরঃ
কংসানুশিষ্টঃ স বকীবকানুজঃ।
অয়ং তুমে সোদরনাশকৃত্তয়ো-
দ্বয়োর্মমৈনং সবলং হনিষ্যে॥
অর্থ :
কৃষ্ণ ও তার সখা গোপবালকদের দেখে
সে ভাবতে লাগল—
“এই হল আমার সহোদর ভাই এবং বোনের হত্যাকারী।
আমি আজ এর সঙ্গীসাথিদের সঙ্গে একে বধ করব।”
নিজের পরিকল্পনাকে সার্থক করতে অঘাসুর নিজের দেহকে যমুনার তীরবর্তী পথের মাঝখানে এক বিস্ময়কর, আনন্দদায়ক গুহার রূপ দেয়— যেন মনে হয় এটি বৃন্দাবনেরই কোনো এক সুন্দর আশ্রয়স্থল।
দুই প্রকার ভক্তির রস
শ্রীমদ্ভাগবতে আমরা দেখি— গোপবালকরা ও গোবৎসরা, যারা সম্পূর্ণভাবে শ্রীকৃষ্ণনির্ভর, সংখ্যায় কয়েক শত হলেও অঘাসুরের মুখে প্রবেশ করে যায়।
অথচ শ্রীকৃষ্ণ তখনও বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই মুহূর্তটি অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে ভগবান একই সঙ্গে দুই প্রকার ভক্তির রস আস্বাদন করছেন।
অন্যদিকে অঘাসুর— অহংকারী, পাপী, অসুরস্বভাব, সর্বদা লাভ ক্ষতির হিসেবে ব্যস্ত। সে এমন একটা কাজ করতে চায় যাতে তার দুদিকেই লাভ হয়।
শ্রীকৃষ্ণ ও গোপপালকদের হত্যা করে সে তার প্রতিশোধ পূরণ করতে চায়, আবার ছল করে শ্রীকৃষ্ণকে স্ব-ইচ্ছায় তার মুখের ভেতর প্রবেশ করিয়ে নিজের কুরুপ অবস্থার পরিবর্তন করে আগের কামদেব সম রূপও ফিরে পেতে চায়। শ্রীকৃষ্ণকে সামনে দেখেও তার শেষ ইচ্ছা ছিল যে শ্রীকৃষ্ণ তার মুখের মধ্যে প্রবেশ করুন এবং তারপর সে সকলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করবে তার মুখের মধ্যে।
আর্ত হয়ে জাগতিক লাভের জন্য হলেও তার একসময়ের নিরন্তর কৃষ্ণ চিন্তা ও কৃষ্ণের খোঁজ তাকে শ্রীকৃষ্ণের অমৃত চরণের সামনে এনে দিয়েছিল।
অন্তে সে অনিষ্টকারী হিসেবে এলেও, পরম দয়াময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় লাভ করেছিল অতি দুর্লভ সাযুজ্য মুক্তি।
শ্রীমৎ ভাগবতম ১০.১২.২৬
তাবৎ প্রবিষ্টান্ত্বসুরোদরান্তরং পরং ন গীর্ণাঃ শিশবঃ সবৎসাঃ।
প্রতীক্ষমানেন বকারিবেশন হতস্বকান্তস্মরণেন রক্ষসা।।
অর্থ :
গোপবালকেরা তাদের গো-বৎস সমেত
অঘাসুরের উদরের ভিতরে প্রবেশ করলেও
সে তাদের ভক্ষণ করল না।
সে প্রতীক্ষা করে রইল—
কতক্ষণে বকারি শ্রীকৃষ্ণ
তার মুখে প্রবেশ করবেন,
কারণ সে তার মৃত ভাই বক
ও বোন পূতনার কথা স্মরণ করে
তাদের হত্যাকারীর ওপর
প্রতিশোধ নিতেই এসেছিল।
📚 প্রাসঙ্গিক বই ও ভিডিও
Little Krishna Adventures Books for Kids
“Little Krishna Adventures: Krishna and Aghasura the Giant Serpent: An Illustrated Hindu Mythology Story for Kids
by Chayan Chatterjee”
📕 Paperback Edition
📙 Hardcover Edition
🎥 অঘাসুর লীলা (ভিডিও)
অঘাসুর উদ্ধার লীলা এই ব্লগের ভিডিও ভার্সন — [পরবর্তীতে লিংক যুক্ত হবে]চতুর্থ ও অন্তিম পর্বে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব—
অঘাসুরের মুক্তি প্রসঙ্গে ভগবৎ পার্ষদ ও বৈষ্ণব ভক্তদের জগতের উপর
কৃপা এবং জীবের উদ্ধার
🔗 [এখানে তৃতীয় পর্বের লিংক যুক্ত হবে]
— পরমানন্দ মাধবম —