📜 স্কন্দপুরাণে বর্ণিত দামোদর মাসের মাহাত্ম্য
পুরাণে বর্ণিত ভগবান বিষ্ণু ও ভক্তির অমৃত কাহিনী
স্কন্দপুরাণ হলো আঠারোটি প্রধান মহাপুরাণের মধ্যে অন্যতম একটি, এবং এটি হর-পার্বতি পুত্র কার্তিক (যিনি স্কন্দ বা মুরুগান নামেও পরিচিত) এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে। এই পুরাণে বিভিন্ন ব্রত, তীর্থস্থান, এবং মাসগুলির গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কার্তিক মাস সম্পর্কেও স্কন্দপুরাণে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
স্কন্দপুরাণে কার্তিক মাস-কে বিশেষভাবে পুণ্যময় মাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি মূলত ভগবান বিষ্ণু এবং দেবী লক্ষ্মী-র পূজা, দীপদান, তুলসী পূজা, এবং বিভিন্ন ব্রত পালনের জন্য অত্যন্ত শুভ।
কার্তিক মাস সম্পর্কে স্কন্দপুরাণে যা বলা হয়েছে তার কিছু মূল বিষয় নিচে দেওয়া হলো:
🌿 ব্রত ও উপবাসের মাহাত্ম্য
স্কন্দপুরাণ অনুসারে, কার্তিক মাসে যারা নিয়মনিষ্ঠভাবে ব্রত পালন করেন, উপবাস করেন, বা সংযম পালন করেন, তারা বিশেষ পুণ্য লাভ করেন। এই মাসে করা সামান্য পুণ্যকর্মও অনেক বেশি ফলদায়ক হয়।
বিশেষ করে একাদশী ব্রত, চতুর্দশী ব্রত এবং কার্তিক পূর্ণিমা-র ব্রত এই মাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণিত হয়েছে।
🪔 দীপদান
কার্তিক মাসে দীপদানকে সর্বোচ্চ পুণ্যকর্মগুলির মধ্যে অন্যতম বলা হয়েছে। স্কন্দপুরাণ উল্লেখ করে যে, যারা কার্তিক মাসে ভগবান বিষ্ণু বা শিব মন্দিরে প্রদীপ দান করেন, অথবা পবিত্র নদীর তীরে বা তুলসী মূলে প্রদীপ জ্বালান, তারা সকল পাপ থেকে মুক্তি পান এবং পুণ্যলোকে স্থান লাভ করেন।
এই মাসে সন্ধ্যাবেলায় আকাশপ্রদীপ (আকাশে প্রদীপ ঝুলানো) জ্বালানোকেও বিশেষ ফলদায়ক মনে করা হয়, যা পিতৃপুরুষদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করে বলে বিশ্বাস করা হয়।
🌿 তুলসী পূজা ও সেবা
স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী, কার্তিক মাসে তুলসী গাছের পূজা এবং সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসে প্রতিদিন তুলসী মূলে জল দেওয়া, প্রদীপ জ্বালানো, এবং তুলসীর কাছে প্রার্থনা করা ভগবান বিষ্ণু-কে অত্যন্ত প্রসন্ন করে।
তুলসী-কে বিষ্ণুপ্রিয়া বলা হয়, এবং কার্তিক মাসে তুলসীর মাহাত্ম্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তুলসী বিবাহ (তুলসী এবং শালগ্রাম শিলার বিবাহ) এই মাসের একটি বিশেষ উৎসব।
🌊 নদী স্নান ও তীর্থযাত্রা
কার্তিক মাসে পবিত্র নদী, যেমন গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, এবং অন্যান্য তীর্থস্থানে স্নান করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। স্কন্দপুরাণ বলে যে, কার্তিক মাসে সূর্যোদয়ের আগে পবিত্র জলে স্নান করলে সকল পাপ ধুয়ে যায় এবং পুণ্য অর্জন হয়।
বিশেষ করে কার্তিক পূর্ণিমায় গঙ্গাস্নান-কে মহাপুণ্যদায়ক বলা হয়েছে।
🙏 ভগবান বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর আরাধনা
এই মাসটি ভগবান বিষ্ণু এবং তাঁর সহধর্মিণী দেবী লক্ষ্মী-র আরাধনার জন্য শ্রেষ্ঠ। কার্তিক মাসে বিষ্ণুর সহস্রনাম জপ, গীতা পাঠ, এবং ভাগবত পুরাণ শ্রবণ করা অত্যন্ত পুণ্যদায়ক বলে স্কন্দপুরাণে বর্ণিত আছে।
এই মাসে লক্ষ্মী পূজা করলে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং পরিবারে সুখ-শান্তি বিরাজ করে।
🕉️ অন্যান্য ব্রত ও দান
অন্নদান, বস্ত্রদান, এবং অন্যান্য সামগ্রী দান করা এই মাসে অত্যন্ত শুভ ফল দেয়। কার্তিক মাসে ব্রহ্মচর্য পালন, সংযম রক্ষা করা, এবং সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করা আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য সহায়ক।
সংক্ষেপে, স্কন্দপুরাণ কার্তিক মাস-কে আধ্যাত্মিক উন্নতি, পাপমোচন, এবং পুণ্য অর্জনের এক অসাধারণ সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই মাসের প্রতিটি দিনকেই পুণ্যকর্মের মাধ্যমে ঈশ্বরের কৃপা লাভের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হয়।
📜 রেফারেন্স
স্কন্দপুরাণ একটি বিশাল গ্রন্থ, এবং এর বিভিন্ন খণ্ডে কার্তিক মাসের মাহাত্ম্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তবে, এর মধ্যে বৈষ্ণব খণ্ড (বিশেষত কার্তিক মাস মাহাত্ম্য অধ্যায়) এবং প্রভাস খণ্ড-এ এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের উল্লেখ করা হচ্ছে, যা স্কন্দপুরাণে কার্তিক মাসের গুরুত্ব তুলে ধরে। যেহেতু স্কন্দপুরাণের বিভিন্ন সংস্করণে অধ্যায় এবং শ্লোকের সংখ্যায় সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে, তাই এখানে মূলত বিষয়বস্তুর উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
🔶 স্কন্দপুরাণে কার্তিক মাসের মাহাত্ম্য (সম্ভাব্য অধ্যায় ও শ্লোক সহ উল্লেখ)
কার্তিক মাসের সর্বশ্রেষ্ঠত্ব
(বৈষ্ণব খণ্ড, কার্তিক মাহাত্ম্য)
স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে, কার্তিক মাস অন্যান্য সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এর কারণ হলো এই মাসে ভগবান বিষ্ণু বিশেষভাবে প্রসন্ন থাকেন।
মূল শ্লোক:
“মাসানাং কার্তিকো মাসো দেবানাং মধুসূদনঃ। তীর্থানাং পুষ্করং তীর্থং স্ত্রীণাং চ পতিদেবতা॥”
(সম্ভাব্য শ্লোক সংখ্যা: ১.১–১০ — বৈষ্ণব খণ্ড, কার্তিক মাস মাহাত্ম্য, প্রথম অধ্যায়)
অর্থ: “মাসগুলির মধ্যে কার্তিক মাস শ্রেষ্ঠ, দেবতাদের মধ্যে মধুসূদন (বিষ্ণু) শ্রেষ্ঠ, তীর্থগুলির মধ্যে পুষ্কর তীর্থ শ্রেষ্ঠ, এবং স্ত্রীলোকের মধ্যে পতিব্রতা শ্রেষ্ঠ।”
দীপদান মাহাত্ম্য
(বৈষ্ণব খণ্ড, অধ্যায় ৪–৭)
দীপদানকে কার্তিক মাস-এর অন্যতম প্রধান পুণ্যকর্ম বলা হয়েছে।
মূল শ্লোক:
“কার্তিকে দীপদানং যঃ কুরুতে বিষ্ণুসংনিধৌ। স সর্বপাপনির্মুক্তো বিষ্ণুলোকং স গচ্ছতি॥”
অর্থ: “যে ব্যক্তি কার্তিক মাসে বিষ্ণুর সম্মুখে দীপদান করে, সে সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়ে বিষ্ণুলোকে গমন করে।”
(সম্ভাব্য শ্লোক সংখ্যা: ৪.২০–৪০)
তাৎপর্য: স্কন্দপুরাণে দীপদানকে যজ্ঞের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। তুলসী মূলে, মন্দিরে, নদীতে বা আকাশে দীপদান করার বিশেষ ফল বর্ণিত আছে।
তুলসী পূজা মাহাত্ম্য
(বৈষ্ণব খণ্ড, অধ্যায় ৮–১১)
কার্তিক মাসে তুলসী পূজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
মূল শ্লোক:
“তুলসীং সেবতে যো বৈ কার্তিকে মাসি নিত্যশঃ। স সর্বপাপনির্মুক্তো বিষ্ণুলোকং স গচ্ছতি॥”
অর্থ: “যে ব্যক্তি কার্তিক মাসে প্রতিদিন তুলসীর সেবা করে, সে সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়ে বিষ্ণুলোকে গমন করে।”
(সম্ভাব্য শ্লোক সংখ্যা: ৮.১৫–৩০)
তাৎপর্য: তুলসীকে বিষ্ণুপ্রিয়া বলা হয় এবং এই মাসে তুলসীর কাছে প্রদীপ জ্বালানো, জল দেওয়া, বা প্রদক্ষিণ করার অসীম পুণ্যফল বর্ণিত আছে। তুলসী বিবাহও এই মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নদী স্নান ও ব্রত মাহাত্ম্য
(প্রভাস খণ্ড ও বৈষ্ণব খণ্ড)
পবিত্র নদীতে স্নান এবং বিভিন্ন ব্রত পালনের ফল।
মূল শ্লোক:
“কার্তিকে প্রাতরুথ্থায় স্নাত্বা পুণ্যে সরিৎসলে। বিষ্ণোঃ পূজাং প্রকুর্বীত মুচ্যতে সর্বকিল্বিষাৎ॥”
অর্থ: “কার্তিক মাসে সকালে উঠে পবিত্র নদীর জলে স্নান করে বিষ্ণুর পূজা করলে সকল পাপ থেকে মুক্তি লাভ হয়।”
(সম্ভাব্য অধ্যায়: প্রভাস খণ্ড, কার্তিক মাস মাহাত্ম্য; অথবা বৈষ্ণব খণ্ড, অধ্যায় ২.২৫–৪৫ ও ১২.১০–৩০)
তাৎপর্য: স্কন্দপুরাণ বিশেষভাবে ব্রহ্মচর্য পালন, একাহারি ব্রত, অন্নদান এবং সাত্ত্বিক জীবনযাপন-এর উপর জোর দেয়। কার্তিক পূর্ণিমায় গঙ্গাস্নান-এর বিশেষ ফল বর্ণিত হয়েছে।
দান ও পিতৃপুরুষের তর্পণ
(বৈষ্ণব খণ্ড, অধ্যায় ১৫–১৮)
কার্তিক মাসে দান এবং পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করার বিশেষ ফল।
বিষয়বস্তু: এই মাসে অন্ন, বস্ত্র, স্বর্ণ এবং অন্যান্য সামগ্রী দান করলে তা বহুগুণ পুণ্যফল প্রদান করে। পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ বা শ্রাদ্ধ করলে তাদের আত্মা শান্তি লাভ করে।
ক. সাধারণ দানের মাহাত্ম্য
(অধ্যায় ১৫–১৬)
কার্তিক মাসে যে কোনো প্রকার দানই—বিশেষ করে ক্ষুধার্তদের অন্নদান, দরিদ্রদের বস্ত্রদান—অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে বিবেচিত।
মূল শ্লোক:
“কার্তিকে যো দদাতি অন্নং ক্ষুধিতেভ্যশ্চ ভক্তিতঃ।
তস্য পুণ্যং ভবেৎ নিত্যং সর্বপাপক্ষয়ং ভবেৎ॥”
অর্থ: “যে ব্যক্তি কার্তিক মাসে ভক্তি সহকারে ক্ষুধার্তদের অন্ন দান করে, তার নিত্য পুণ্য হয় এবং তার সকল পাপ ক্ষয় হয়।” (অধ্যায়: ১৫–১৬, দান মাহাত্ম্য প্রকরণ)
তাৎপর্য: অন্নদানের মাধ্যমে পাপমোচন এবং অক্ষয় পুণ্য লাভ হয়। এই মাসে অন্নদানকে যজ্ঞের সমান ফলদায়ক বলা হয়েছে।
খ. পিতৃপুরুষদের শ্রাদ্ধ ও তর্পণ
(অধ্যায় ১৭–১৮)
কার্তিক মাসে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ, তর্পণ বা পিণ্ডদান করলে তাদের আত্মা শান্তি লাভ করে এবং দাতা পুণ্য অর্জন করে।
মূল শ্লোক:
“কার্তিকে যো নরঃ কুর্যাত পিতৃণামুদ্দিশ্য তর্পণম্।
তস্য তৃপ্তা ভবেয়ুস্তে পিতরঃ সর্বকামদাঃ॥”
অর্থ: “যে মানব কার্তিক মাসে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে, তার সেই পিতৃপুরুষগণ তৃপ্ত হন এবং সকল কামনা পূর্ণ করেন।”
(অধ্যায়: ১৭–১৮, পিতৃকর্ম মাহাত্ম্য)
তাৎপর্য: এই শ্লোকটি পিতৃপুরুষদের তুষ্টি এবং তাদের আশীর্বাদ লাভের জন্য কার্তিক মাসে তর্পণ-এর গুরুত্বকে তুলে ধরে। এটি পিতৃঋণ পরিশোধের এক উৎকৃষ্ট উপায়।
🌼 উপসংহার
স্কন্দপুরাণ-এর বৈষ্ণব খণ্ড-এর কার্তিক মাস মাহাত্ম্য বিষয়ক অধ্যায়গুলি (১৫–১৮) দান-পুণ্য এবং পিতৃসন্তুষ্টি-র গুরুত্ব তুলে ধরে। এই মাসকে কেবল ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য নয়, বরং সামাজিক কল্যাণ ও পূর্বপুরুষদের প্রতি কর্তব্য পালনের জন্যও এক পবিত্র সময় বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
🕉️ গুরুত্বপূর্ণ নোট
স্কন্দপুরাণ-এর বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্করণে অধ্যায় ও শ্লোকসংখ্যায় পার্থক্য থাকতে পারে। তবে মূল বক্তব্য সর্বত্র একই — কার্তিক মাস হলো ধর্মীয় উপাসনা, দীপদান এবং বিষ্ণুভক্তি-র জন্য সর্বোৎকৃষ্ট সময়।
উল্লেখ: নির্দিষ্ট সংস্করণের সূচিপত্র থেকে ‘কার্তিক মাস মাহাত্ম্য’ অধ্যায় অনুসন্ধান করলে এসব শ্লোক সহজে খুঁজে পাওয়া যায়।
🔹 পদ্ম পুরাণে বর্ণিত দামোদর বা কার্তিক মাস মাহাত্ম্য 🔹 রামায়ণ ও মহাভারতে বর্ণিত কার্তিক মাস মাহাত্ম্য 🔹 ব্রতের নিয়মাবলী ও হরি ভক্তি বিলাসে বর্ণিত দামোদর মাস মাহাত্ম্য
🔹 শ্রী দামোদর অষ্টকম স্তোত্র পাঠ ও অর্থ আলোচনা
📖 সূচিপত্রে ফিরে যান
#KartikMaas #SkandaPurana #Bhakti #VishnuMahatmya #Deepdaan #DamodarMonth #TulasiPuja #PitrTarpan #Devotion #Purana



No comments:
Post a Comment